ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তব আর্থিক অবস্থার পুনর্মূল্যায়নের ফলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশের ব্যাংক খাত সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এটি সবচেয়ে বড় ক্ষতির ঘটনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা বিষয়ক প্রতিবেদন ও মাসিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ক্ষতি পুরো খাতের আর্থিক ফলাফলকে নেতিবাচক অবস্থায় নিয়ে গেছে। বিশেষ করে একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় থাকা কয়েকটি ব্যাংক এবং নানা অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় এই বড় লোকসান দৃশ্যমান হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। পরের বছর তা কিছুটা বেড়ে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে ২০২৪ সালে মুনাফা কমে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। এরপর ২০২৫ সালে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গিয়ে পুরো খাতই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ব্যাংকে প্রকৃত খেলাপি ঋণ, ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ এবং দুর্বল সম্পদের তথ্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিচালিত সম্পদমান যাচাইয়ের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে পূর্বে আড়ালে থাকা বিপুল ক্ষতির হিসাব একসঙ্গে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে নয়টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত এই মূল্যায়নে কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতা ধরা পড়ে। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক বর্তমানে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। অন্য কয়েকটির অবস্থাও উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এর আগেও সংস্কার কার্যক্রমের সময় বড় ধরনের লোকসানের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৪ সালে ব্যাংক খাতের সম্মিলিত লোকসান ছিল ৭৭৬ কোটি টাকা এবং ২০০৬ সালে তা বেড়ে ২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নির্ধারণে বিশেষ নিরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেই সময়ও প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় ব্যাংকগুলো ক্ষতির মুখে পড়ে। এছাড়া ২০১২ সালে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রভাবে পুরো ব্যাংক খাত ১ হাজার ৯৫ কোটি টাকা লোকসান দেখেছিল।
২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষতি ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের লোকসান ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকও উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে মাত্র ১০টি ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। তবে কিছু শক্তিশালী দেশি ও বিদেশি ব্যাংকের ভালো মুনাফার কারণে সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে।
মুনাফার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং পূবালী ব্যাংক এক হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংকের ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ আয়হীন ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলো যে ঋণ বিতরণ করেছে, তার প্রায় ৫৯ শতাংশ এখন ‘দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থাৎ এই ঋণগুলোর বড় অংশ থেকে নিয়মিত আয় আসছে না কিংবা ঋণগ্রহীতারা নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করছেন না।
২০২৫ সালের শেষে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ। বাকি অংশ রয়েছে খেলাপি ঋণ, অবলোপন করা ঋণ এবং আদালতের আদেশে সাময়িকভাবে স্থগিত থাকা ঋণের মধ্যে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতের এই চিত্র কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। কারণ ব্যাংকই অর্থনীতির প্রধান অর্থায়ন উৎস। ঋণের বড় অংশ আয়হীন হয়ে পড়লে নতুন বিনিয়োগে অর্থ সরবরাহ কমে যায়, ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমানতকারীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রকৃত আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ প্রকাশ ভবিষ্যৎ সংস্কারের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সহজ হবে না। তাই ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কঠোর তদারকি ও কার্যকর সংস্কার এখন সময়ের অন্যতম বড় দাবি।

