দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ ‘দুর্দশাগ্রস্ত’—গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন দাবিকে সরাসরি নাকচ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, এ ধরনের হিসাব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে নয় এবং এতে ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হয়নি। বরং ভুল পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের ঋণ একসঙ্গে যোগ করে বিভ্রান্তিকর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগাযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’-এর বিশ্লেষণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ওই পরিসংখ্যানকে ব্যাংক খাতের ঝুঁকির নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে আনুষ্ঠানিক খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নিরীক্ষিত ও চূড়ান্ত এই তথ্যই বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং প্রামাণ্য হিসাব।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ও অবলোপনকৃত ঋণ যোগ করে ‘দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’ হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের পদ্ধতির পক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত কোনো একক সংজ্ঞা বা মানদণ্ড নেই। ফলে এসব উপাদান একত্র করে যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ‘দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ’ বিষয়ে অভিন্ন কোনো সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঋণের ব্যাখ্যা ও পরিমাপের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
সাধারণভাবে যেসব ঋণ থেকে আয় আসে না বা নিয়মিত কিস্তি আদায় সম্ভব হয় না, সেগুলোকে সমস্যাগ্রস্ত বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে পুনঃতফসিলের আওতায় থাকা এবং নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা ঋণকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তাদের মতে, পুনঃতফসিলকৃত অনেক ঋণ বর্তমানে সচল রয়েছে এবং সেগুলো থেকে ব্যাংক নিয়মিত নগদ প্রবাহ পাচ্ছে। ঋণগ্রহীতারা অনুমোদিত পুনর্গঠন বা ছাড়ের আওতায় নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করায় এসব ঋণকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা সঠিক নয়।
অন্যদিকে অবলোপনকৃত ঋণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক হিসাবরীতি অনুযায়ী এসব ঋণ মূল ব্যালেন্স শিটের বাইরে সংরক্ষণ করা হয়। ফলে ব্যাংকের চলমান ঋণ পোর্টফোলিও বা বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এগুলোকে সরাসরি যোগ করার সুযোগ নেই।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, যাচাইবিহীন বা কারিগরিভাবে দুর্বল তথ্যের ভিত্তিতে আর্থিক খাত সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, উন্নয়ন সহযোগী ও অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে। এর ফলে আর্থিক খাতের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা উচিত। কারণ অসম্পূর্ণ বা ভুল বিশ্লেষণ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্ম দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং সুশাসনের নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তবে এসব সমস্যার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরীক্ষিত তথ্য এবং স্বচ্ছ পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই কারণেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
ব্যাংক খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্য নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক চলছে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ব্যাখ্যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে—ভুল পদ্ধতিতে হিসাব করে সংকটকে আরও বড় করে দেখানো হলে তা বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না।

