ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের পদত্যাগ বা অপসারণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দেশের ব্যাংকিং খাতে। বিদ্যমান নীতিমালায় শীর্ষ নির্বাহীদের স্বার্থ রক্ষায় শুনানির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ব্যাংকের এমডি ও সিইও দায়িত্ব ছাড়লেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক শুনানির নজির পাওয়া যায়নি।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিচালনা পর্ষদের চাপ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং করপোরেট ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে অনেক সময় এমডিদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এমন অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সুরক্ষা কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হলে শীর্ষ নির্বাহীরা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডির পদত্যাগ। পূর্ণকালীন দায়িত্ব পাওয়ার আগেই তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদ ছাড়েন। বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে চাপের অভিযোগ উঠলেও তিনি প্রকাশ্যে সে বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি। তবে নিজের মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
আরেকটি বড় ইসলামী ধারার ব্যাংকের এমডির পদত্যাগও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানও দায়িত্ব ছাড়েন। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিলে গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় এবং কয়েক সপ্তাহ ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাখ্যান করেছে।
ব্যাংক খাতের একাধিক সূত্র বলছে, গত এক বছরে অনেক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পরিবর্তন হয়েছে। কারও পদত্যাগের পেছনে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও, কিছু ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে মতবিরোধ বা চাপের বিষয়টি সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—নীতিমালায় থাকা সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর?
অবশ্য সব পদত্যাগকে বিতর্কিত হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। অনেক কর্মকর্তা নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বা ব্যক্তিগত কারণে দায়িত্ব ছেড়েছেন। কয়েকজন সাবেক এমডি জানিয়েছেন, পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে সব ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো এমডি বা সিইও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করলে বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হয়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণের কথা রয়েছে। সেই শুনানির ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিধান আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শুনানি প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো কর্মকর্তা চাপ, ভয়ভীতি বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন কি না, তা যাচাই করা। কিন্তু বাস্তবে যদি এই ধাপটি নিয়মিত অনুসরণ না করা হয়, তাহলে পুরো সুরক্ষা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, পরিচালনা পর্ষদ ও এমডির সম্পর্ক সবসময় সহজ হয় না। পর্ষদ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, আর বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে এমডির ওপর। অনেক সময় ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কিংবা করপোরেট গভর্ন্যান্সের বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়। তখন এমডির ওপর চাপ বাড়তে পারে।
তাদের মতে, একজন এমডি ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও তার প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় তদারকির ওপর। কিন্তু সেই তদারকি দুর্বল হলে শীর্ষ নির্বাহীদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। এমডিরা যদি সবসময় চাকরি হারানোর আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ বা অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার সাহস কমে যেতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো ব্যাংকিং খাত।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, তার কঠোর ও স্বচ্ছ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়া ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং নির্বাহীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। অন্যথায় নীতিমালার কাগুজে সুরক্ষা বাস্তব সংকট মোকাবিলায় খুব বেশি কাজে আসবে না।

