দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের অন্যতম পুরোনো প্রতিষ্ঠান এনসিসি ব্যাংক ৩৩ বছর পার করে ৩৪তম বছরে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ এই পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবেই নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর, গ্রাহককেন্দ্রিক ও টেকসই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ব্যাংকিং খাতে নানা চ্যালেঞ্জ, আস্থার সংকট ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও নিজেদের স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি।
এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন বলেন, প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালে একটি মার্চেন্ট ব্যাংক হিসেবে। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপ নেয়। শুরু থেকেই শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য ছিল ব্যাংকটির। তিন দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতায় সেই লক্ষ্য শুধু অর্জিতই হয়নি, বরং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বড় করপোরেট গ্রাহক, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে সুশাসন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্বশীল ব্যাংকিং কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের টেকসই ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে এনসিসি ব্যাংক।
দেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আস্থার সংকট বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের উদ্বেগের মুখে পড়লেও এনসিসি ব্যাংক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ব্যাংকটির মতে, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং ঋণ বিতরণে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি।
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা মনে করেন, গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে শুধু আর্থিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দ্রুত সেবা। সেই লক্ষ্যেই ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় ধীর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির মতো নানা কারণে বিনিয়োগ পরিবেশও চাপে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এনসিসি ব্যাংক উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিরাপদ বিনিয়োগ কৌশল অনুসরণ করছে।
ব্যাংকটির দাবি, কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, রপ্তানিমুখী খাত এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির বাস্তব খাতকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে সরকারি সিকিউরিটিজ ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তারল্য ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির কথা জানিয়েছে এনসিসি ব্যাংক। খুচরা গ্রাহক, করপোরেট গ্রাহক এবং ইসলামি ব্যাংকিং সেবার আওতায় নতুন আমানত বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তার এবং গ্রাহকদের জন্য সহজ ব্যাংকিং সুবিধা তৈরির ফলে নতুন হিসাব খোলার প্রবণতাও বেড়েছে।
বিশেষ করে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবভিত্তিক কম ব্যয়বহুল আমানত বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে ব্যাংকটি। পাশাপাশি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং খাত দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এনসিসি ব্যাংকও নিজেদের ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে করপোরেট গ্রাহকদের জন্য পৃথক ইন্টারনেট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম এবং সাধারণ গ্রাহকদের জন্য মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা চালু রয়েছে। এছাড়া ইলেকট্রনিক গ্রাহক পরিচিতি যাচাই, স্বয়ংক্রিয় সেবা প্ল্যাটফর্ম এবং কিউআরভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে শাখানির্ভরতা কমানো হয়েছে।
ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাংকিং সেবা, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা, আরও শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা, ভার্চ্যুয়াল কার্ড, ডিজিটাল ঋণসেবা এবং ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম। তরুণ প্রজন্মের গ্রাহকদের চাহিদা বিবেচনায় কাগজবিহীন ও নগদবিহীন ব্যাংকিং সেবাও সম্প্রসারণ করা হবে।
গত এক বছরে অর্থনৈতিক চাপ ও বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যেও ব্যাংকটি আমানত ও তারল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করেছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি, নন-ফান্ডেড আয় সম্প্রসারণ এবং ঋণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
এনসিসি ব্যাংকের মতে, আগামী দিনের লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির সমন্বয়ে একটি স্মার্ট ও আধুনিক ব্যাংক হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা। ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তিত বাস্তবতায় গ্রাহকের আস্থা, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনাকেই ভবিষ্যৎ সাফল্যের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।

