বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে জাপানের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিধি কার্যালয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার পর এবার দেশে পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে একই সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও জানিয়েছে ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে এমইউএফজি ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরে। বৈঠকে তারা দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা, বিদেশি ব্যাংকের জন্য নীতিগত পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
টোকিওভিত্তিক এমইউএফজি ব্যাংক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি। জাপানের বৃহত্তম ব্যাংকিং গ্রুপের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে ১৯৯০ সাল থেকে তাদের প্রতিনিধি অফিস থাকলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি নেয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এমইউএফজি মূলত ‘করিডোর ব্যাংকিং’ মডেলে কাজ করতে আগ্রহী। এ ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থপ্রবাহকে সহজ করতে বিশেষায়িত আর্থিক সেবা দেওয়া হয়। ফলে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকটি দেশে কার্যক্রম শুরু করলে বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী জাপানি কোম্পানিগুলো সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে। করপোরেট ঋণ, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, বাণিজ্য অর্থায়ন, ব্যাংক গ্যারান্টি এবং বিনিয়োগ-সম্পর্কিত বিভিন্ন সেবা আরও সহজ ও দ্রুত পাওয়া যাবে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ আরও অনুকূল হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে শতাধিক জাপানি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। অবকাঠামো, উৎপাদনশিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে জাপানি বিনিয়োগের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিজ দেশের পরিচিত ব্যাংকের উপস্থিতি থাকলে নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে এমইউএফজির শাখা চালু হলে নতুন জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বার্ষিক কয়েক বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিদ্যমান। এর মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী জাপানে রপ্তানি হয়, অন্যদিকে শিল্পযন্ত্র, প্রযুক্তিপণ্য এবং বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি করা হয়। উন্নত ব্যাংকিং সুবিধা যুক্ত হলে এই বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। এমইউএফজির স্থানীয় শাখা চালু হলে এসব লেনদেন আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ—খেলাপি ঋণ—নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপানি ব্যাংকটি। বৈঠকে প্রতিনিধিদল জানতে চায়, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণের চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন করে কার্যক্রম শুরু করা কতটা নিরাপদ এবং বিদেশি ব্যাংকের জন্য ভবিষ্যৎ নীতিগত পরিবেশ কেমন হবে।
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। বর্তমানে চলমান সম্পদমান পর্যালোচনা কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক খাতের সংস্কারে বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশে পরিচালিত বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার স্থানীয় অনেক ব্যাংকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করলে বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য ব্যবসায়িক সুযোগ এখনও যথেষ্ট উজ্জ্বল।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এমইউএফজির মতো একটি বৈশ্বিক ব্যাংকের আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি একদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে, অন্যদিকে দেশের আর্থিক খাতে প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তি ও সেবার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে, জাপানের এই শীর্ষ ব্যাংকের সম্ভাব্য আগমন শুধু একটি নতুন ব্যাংক শাখা খোলার বিষয় নয়; বরং এটি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

