দেশে ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী ১ জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের আর্থিক লেনদেন আরও সহজ, নিরাপদ ও আধুনিক হবে।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ‘বাংলা কিউআর লেনদেন বিষয়ক ক্যাম্পেইন’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার এবং নগদবিহীন অর্থনীতি গঠনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, বাংলা কিউআর চালুর মূল লক্ষ্য হলো দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনা। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা খুচরা টাকা বহনের ঝামেলা ছাড়াই নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। একই সঙ্গে লেনদেন হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরাপদ।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রতিটি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের পরিধি কমে আসবে। এতে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজস্ব অ্যাপসে বাংলা কিউআর সুবিধা যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানদার এবং সাধারণ গ্রাহক সহজেই একই প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ। তিনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং কর আহরণও সহজ হবে। এর ফলে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, আগামী বছর দেশে একটি আন্তঃসংযুক্ত তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যেকোনো ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ওয়ালেটের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে। ফলে আর্থিক সেবার গতি ও দক্ষতা আরও বাড়বে।
কবির আহমেদের মতে, শক্তিশালী ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, লেনদেন ব্যয় কমানো এবং জরুরি সময়ে দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকায় মানি লন্ডারিং ও আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানো। এ উপলক্ষে ব্যাংক প্রাঙ্গণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অস্থায়ী স্টল স্থাপন করা হয়, যেখানে কিউআর স্ক্যানের মাধ্যমে পণ্য কেনাবেচা ও বিল পরিশোধের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
ক্যাম্পেইনে দেশের শীর্ষস্থানীয় ভোগ্যপণ্য, খুচরা বিক্রয় ও সেবা খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি বাংলা কিউআর ব্যবহার করে কেনাকাটার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার বিস্তার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বাংলা কিউআর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।

