বাংলাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণের আগ্রহ দেখিয়েছে জাপানের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি ব্যাংক। প্রায় তিন দশক ধরে ঢাকায় প্রতিনিধি কার্যালয় পরিচালনার পর এবার তারা দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক শাখা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। তবে একই সঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মিতসুবিশি ইউএফজে ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যাংকিং সহযোগী প্রতিষ্ঠান এমইউএফজি ব্যাংক জাপানের সবচেয়ে বড় ব্যাংকিং গ্রুপগুলোর একটি। বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবায় প্রতিষ্ঠানটির বিস্তৃত উপস্থিতি রয়েছে। এর সদর দপ্তর টোকিওতে অবস্থিত।
গত ২২ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরের সঙ্গে এমইউএফজি ব্যাংকের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বৈঠক করে। প্রতিনিধি দলে ছিলেন এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী ইউকিনোবু সায়েকি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান ওসামু আবে, ভাইস প্রেসিডেন্ট সোতারো ইতো, ঢাকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান প্রতিনিধি কেঞ্জি কিমুরা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট গোলাম কিবরিয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ১৯৯০ সাল থেকে ঢাকায় প্রতিনিধি অফিস পরিচালনা করা এমইউএফজি এখন পূর্ণাঙ্গ শাখা চালুর বিষয়ে কাজ করছে। এরই মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে শাখাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে ব্যাংকটি।
বাংলাদেশে তারা ‘করিডোর ব্যাংকিং’ মডেল অনুসরণ করতে চায়। এই পদ্ধতিতে দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থ প্রবাহ সহজ করতে বিশেষায়িত আর্থিক সেবা দেওয়া হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর আর্থিক সংযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশে এমইউএফজি ব্যাংকের শাখা চালু হলে এখানে কর্মরত জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য করপোরেট ঋণ, বাণিজ্য অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ ও কার্যকর হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কর্মকর্তাটি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিজেদের পরিচিত ও বিশ্বস্ত ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনায় বেশি আগ্রহী হন। ফলে এমইউএফজির উপস্থিতি জাপানি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া আমদানি-রপ্তানিকারকদের জন্য ঋণপত্র, ব্যাংক গ্যারান্টি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক আর্থিক সুবিধা দ্রুত পাওয়া যাবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় উভয়ই কমবে।
তার মতে, বিশ্বমানের একটি ব্যাংকের শাখা চালু হলে বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতাও আরও শক্তিশালী হবে। এতে নতুন জাপানি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা দেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলো অনুসন্ধানে উৎসাহিত হতে পারেন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করে। আর্থিক সেবার প্রক্রিয়া আরও সহজ হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির উল্লেখযোগ্য অংশের আর্থিক লেনদেন এমইউএফজির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশে ব্যাংকটির শাখা চালু হলে এসব লেনদেনে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। পাশাপাশি ব্যয় কমার পাশাপাশি সেবার দক্ষতাও বাড়বে।
বৈঠকে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এমইউএফজি ব্যাংক। প্রতিনিধিদল জানতে চায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে নতুন শাখা স্থাপনের জন্য এটি উপযুক্ত সময় কি না। পাশাপাশি বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রসারণ নিয়ে ভবিষ্যৎ নীতিগত পরিকল্পনার বিষয়েও জানতে চেয়েছে তারা।
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, দীর্ঘ সময় ধরে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। বর্তমানে চলমান সম্পদ গুণগত মান পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে পরিচালিত বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে কম। সে কারণে এমইউএফজি বাংলাদেশে শাখা খুললে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গভর্নর প্রতিনিধিদলকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এবং আগামী বছরগুলোতে পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকের সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে এমইউএফজি ব্যাংককে বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ শাখা স্থাপন এবং প্রচলিত ব্যাংকিং সেবায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক সহায়তা দেওয়া হবে বলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

