দেশের ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কারকে নতুন ঋণ কর্মসূচির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি সরকারের কাছে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক সংস্কার পরিকল্পনা চেয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইনে সম্প্রতি যুক্ত হওয়া একটি বিতর্কিত ধারা নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানিয়ে সেটি বাতিলের সুপারিশ করেছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও ওই ধারা প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতোমধ্যে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকার গত ১ জুন আইএমএফের কাছে নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করার পর দুই পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। সেই আলোচনায় ব্যাংক খাতের সুশাসন, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং আইনগত সংস্কারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৮ (এ) ধারা। এই বিধানের আওতায় জোরপূর্বক একীভূত বা পুনর্গঠিত কোনো ব্যাংকের মালিকানা ভবিষ্যতে আগের মালিকদের কাছে ফেরত যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আইএমএফের মূল্যায়নে, এমন বিধান আর্থিক খাতে জবাবদিহি দুর্বল করতে পারে এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার পথ খুলে দেয়। এতে ব্যাংক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন থেকে ১৮ (এ) ধারা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে এ বিষয়ে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে শুধু একটি ধারা বাতিল করাই আইএমএফের প্রত্যাশা নয়। সংস্থাটি মনে করছে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণের বোঝা কমানো, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও একীভূতকরণ কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা ছাড়া টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। এ কারণে এসব বিষয়ে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়সূচি সরকারের কাছে চাওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং কিছু ব্যাংকের আর্থিক সংকট দেশের ব্যাংকিং খাতকে চাপে ফেলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছেও খাতটির প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আইএমএফ সেই আস্থা পুনর্গঠনের জন্য কাঠামোগত সংস্কারকে অপরিহার্য বলে মনে করছে।
ব্যাংক খাতের পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি সব খাতে অভিন্ন ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট কার্যকর করার পক্ষে মত দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মোট লেনদেনের ওপর টার্নওভার কর আরোপের বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে।
তবে সরকারের অবস্থান কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, একক ভ্যাট ব্যবস্থার নীতিগত ধারণার সঙ্গে সরকার একমত হলেও হার ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করতে চায়। কারণ তুলনামূলক কম হার ব্যবসা ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের জন্য সহনীয় হতে পারে।
টার্নওভার করের ক্ষেত্রেও সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এগোতে আগ্রহী নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকলেও যদি মোট বিক্রির ওপর কর দিতে হয়, তাহলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবব্যবস্থা ও ডিজিটাল অবকাঠামোর আধুনিকায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর এ ধরনের কর ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী জুলাইয়ের মাঝামাঝি আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করবে। তারা ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা এবং সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। এই মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় ঋণ কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে নতুন ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। আইএমএফের কোটাভিত্তিক নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৪৬৪ কোটি বিশেষ অঙ্কন অধিকার সমপরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৬১৫ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ঋণ পাওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কারণ শক্তিশালী ও স্বচ্ছ ব্যাংক ব্যবস্থা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই আইএমএফের শর্তগুলো শুধু ঋণ পাওয়ার পূর্বশর্ত নয়, বরং দেশের আর্থিক খাতকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

