দেশে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও সবার জন্য অভিন্ন করতে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
তাঁর ভাষ্য, নগদ অর্থনির্ভর লেনদেনের যুগ থেকে বাংলাদেশ এখন দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সার্বজনীন পেমেন্ট স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে চালু করা হয়েছে ‘বাংলা কিউআর’, যার মাধ্যমে একটি কিউআর কোড ব্যবহার করেই ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে সহজে অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় গভর্নর বলেন, আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কিউআর কোড ব্যবহার করত। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের কিউআর অন্য প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ দিয়ে ব্যবহার করা যেত না। এতে গ্রাহক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষকেই নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়তে হতো। বাংলা কিউআর চালুর ফলে সেই সীমাবদ্ধতা দূর হয়েছে এবং এখন একটি অভিন্ন কিউআর কোড দিয়েই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা লেনদেন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে রাজধানীর বড় বিপণিবিতান থেকে শুরু করে ছোট মুদি দোকান, রেস্টুরেন্ট, ফুটপাতের ব্যবসা কিংবা স্থানীয় বাজার—সব জায়গাতেই একই ধরনের কিউআর কোড ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে ব্যবসায়ীদের একাধিক কিউআর প্রদর্শনের প্রয়োজন হবে না এবং গ্রাহকরাও যেকোনো সমর্থিত ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে সহজে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন।
গভর্নরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলা কিউআর ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও অত্যন্ত সহজ। গ্রাহক প্রথমে নিজের ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপে প্রবেশ করবেন, এরপর দোকানে প্রদর্শিত কিউআর কোড স্ক্যান করবেন। প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করে পিন নম্বর অথবা এককালীন নিরাপত্তা কোড (ওটিপি) ব্যবহার করলেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লেনদেন সম্পন্ন হবে। এতে নগদ টাকা বহন বা খুচরা অর্থের ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার শুধু গ্রাহকের সুবিধাই বাড়াবে না, বরং জাল নোট, ছেঁড়া নোট কিংবা ভুল টাকা ফেরতের মতো সমস্যাও অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। একই সঙ্গে যে কোনো অঙ্কের অর্থ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
গভর্নর আরও উল্লেখ করেন, বাংলা কিউআর চালুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো এর কম পরিচালন ব্যয়। প্রচলিত অনেক ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর তুলনায় কিউআরভিত্তিক ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনা সহজ হওয়ায় বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরাও অল্প খরচে এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবেন। এর ফলে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত বাংলা কিউআর ব্যবহার করলে তাদের লেনদেনের একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল ইতিহাস তৈরি হবে। ভবিষ্যতে এই তথ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যবসার সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে জামানত ছাড়াই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন।
তবে প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন গভর্নর। তিনি বলেন, ব্যাংক হিসাবের পিন নম্বর, ওটিপি বা অন্য কোনো গোপন তথ্য কখনোই ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী ব্যক্তি বা অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করা যাবে না। এই তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখাই নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের অন্যতম শর্ত।
গভর্নরের মতে, বাংলা কিউআরের ব্যবহার যত বাড়বে, ততই নগদ অর্থ ছাপানো, সংরক্ষণ, পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যয় কমবে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি অভিন্ন কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হওয়া দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু গ্রাহকের লেনদেনকে সহজ করবে না, বরং ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে আন্তঃসংযোগও শক্তিশালী করবে। দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে গভর্নর সবাইকে বাংলা কিউআর ব্যবহারে উৎসাহিত করে বলেন, এটি শুধু একটি নতুন পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়, বরং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁর মতে, বাংলা কিউআরের ব্যাপক ব্যবহার বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করে তুলবে।

