মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও গত অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি, তবু বর্তমান বাস্তব প্রবৃদ্ধির তুলনায় নতুন লক্ষ্য কিছুটা বেশি রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি প্রকাশ করে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক তুলে ধরা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৫ শতাংশে। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল সাড়ে ৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাস্তব প্রবৃদ্ধি নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি আগের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হলেও বর্তমান বাস্তব প্রবৃদ্ধির তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। একই মুদ্রানীতিতে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহারে ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। একই সঙ্গে ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান বা স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। এর ফলে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত সুদহার নির্ধারণের সুযোগ পাবে না।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশে পৌঁছাবে। আর আগামী বছরের জুন নাগাদ তা ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে ধীরগতি, শিল্প খাতের অনিশ্চয়তা এবং ব্যবসায়ীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হয়েছে।
তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ঋণ প্রবাহে সংযম প্রয়োজন হলেও উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সক্ষমতা।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন লক্ষ্য একদিকে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে, অন্যদিকে ব্যবসা ও শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখারও চেষ্টা করবে। তবে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

