চলতি সপ্তাহেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন আবেদুর রহমান সিকদার। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পর তাঁর যোগদানের মাধ্যমে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করার বহু প্রতীক্ষিত প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা প্রশাসকদের ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়মিত ব্যবস্থাপনার হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতিও শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
দেশের ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন উদ্যোগগুলোর একটি হচ্ছে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। দীর্ঘদিন ধরে তারল্য সংকট, সুশাসনের ঘাটতি এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক যোগ দেওয়ার পর এই পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন এমডি আবেদুর রহমান সিকদার এর আগে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরও আগে তিনি ব্র্যাক ব্যাংকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা একীভূত প্রতিষ্ঠানের নতুন পরিচালন কাঠামো গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাঁচটি ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা। বর্তমানে প্রতিটি ব্যাংক পৃথক প্রযুক্তি ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে গ্রাহকসেবা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, তথ্য সংরক্ষণ এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে সমন্বয় আনতে সফটওয়্যার একীভূত করা অত্যন্ত জরুরি। এই কাজ সম্পন্ন হলে সব কার্যক্রম একটি একক প্রযুক্তি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে।
সফটওয়্যার একীভূত হওয়ার পর পাঁচটি ব্যাংকের পৃথক পরিচয় বিলুপ্ত করে একটি মাত্র নাম—‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’—ব্যবহার করা হবে। একই সঙ্গে নতুন আমানত প্রকল্প, ঋণসেবা এবং গ্রাহকবান্ধব আর্থিক পণ্য চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে বাজারে ব্যাংকটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।
বর্তমানে পাঁচটি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে নতুন এমডি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসকদের ভূমিকা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে স্বাভাবিক করপোরেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনার পথ সুগম হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের আওতায় এসেছে ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক সংকটে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি চারটি একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো ব্যাংকমালিকদের সংগঠন ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে।
একীভূতকরণ কার্যক্রম শুরু হলেও প্রথম দিকে নেতৃত্বসংক্রান্ত জটিলতায় কিছুটা ধীরগতি দেখা দেয়। প্রথমে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল মুস্তাফিজুর রহমানের। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি। একই সময়ে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়ার পদত্যাগও পুরো প্রক্রিয়াকে কিছুটা পিছিয়ে দেয়।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার এই একীভূতকরণ উদ্যোগ নেয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো তৈরি করে একীভূতকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করে। গত বছরের ৩০ নভেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়।
নতুন ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দিয়েছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের জমার বিপরীতে শেয়ার বরাদ্দের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে। এই মূলধন কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বিশেষ কর্মসূচি চালু করেছে। বর্তমানে দুই লাখ টাকার কম আমানতধারীদের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী বড় অঙ্কের আমানতও ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পাঁচটি ব্যাংককে প্রশাসনিকভাবে একীভূত করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে সুশাসন নিশ্চিত করা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সর্বোপরি আমানতকারীদের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর। নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।

