দেশের ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত বা অলস অর্থের পরিমাণ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। একদিকে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বাড়লেও অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের স্থবিরতা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ব্যাংকিং খাতের শক্তিশালী অবস্থানের প্রতিফলন নয়; বরং খেলাপি ঋণের বিস্তার, বিনিয়োগের দুর্বল গতি এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে সৃষ্ট একটি কাঠামোগত সংকেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস শেষে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উদ্বৃত্ত অর্থ বেড়েছে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা। আর দেড় বছরে এর পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকায়। এরপরও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালের মে মাসে তা ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণভাবে ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য থাকা ইতিবাচক বলে মনে হলেও বর্তমান পরিস্থিতির বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যাংকগুলো পর্যাপ্ত অর্থ হাতে রেখেও তা উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তারল্য সম্পদের পরিমাণ এখন ৭ লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ বা ৫ লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ রয়েছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো অলস অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ খাতে না দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ বিতরণ করলে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। বিপরীতে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করলে নির্দিষ্ট হারে নিশ্চিত আয় পাওয়া যায় এবং অর্থ ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কাও থাকে না। এ কারণেই অধিকাংশ ব্যাংক ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ বিনিয়োগের পথ বেছে নিচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এক বছর আগে এই প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, ব্যাংক ঋণের প্রবাহ কমে গেলে শিল্পকারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহে সমস্যায় পড়ে। এতে উৎপাদন কমে যায়, নতুন বিনিয়োগ পিছিয়ে যায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে অনীহার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে দ্রুত বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ শতাংশেরও বেশি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই পরিস্থিতিতে প্রায় ২০টি ব্যাংক কার্যত নতুন ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছে। অন্য ব্যাংকগুলোও কঠোর যাচাই-বাছাই ছাড়া নতুন ঋণ অনুমোদন করছে না। ফলে অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ থাকলেও উৎপাদনমুখী খাতে সেই অর্থের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। ফলে সরকারি ঋণ গ্রহণের চাপও ব্যাংকিং খাতের অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়কালের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার উদ্বৃত্ত তারল্য সব ব্যাংকে সমানভাবে বণ্টিত নয়। কিছু ব্যাংকে অতিরিক্ত অর্থ জমা থাকলেও অন্য কয়েকটি ব্যাংক এখনও তারল্য সংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে দুর্বল ঋণ চাহিদা, আমানতের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলেই ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শুধু ব্যাংকগুলোর তারল্য বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোই হতে পারে অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম প্রধান শর্ত।

