ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী রেজা ইফতেখারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান অনুসন্ধান প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
একাধিকবার নথিপত্র চাওয়া এবং চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার পরও সম্পূর্ণ তথ্য না পাওয়ায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে তথ্য সরবরাহে গড়িমসির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে দুদকের।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত বছর শুরু হওয়া অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েক দফায় প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য চাওয়া হয়। প্রতিবারই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সময় বাড়ানোর আবেদন করে। সর্বশেষ গত মাসে অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান ১০ কর্মদিবস সময় বেঁধে একটি চূড়ান্ত নোটিশ জারি করেন। সেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য সরবরাহ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়।
তবে ওই নোটিশের পরও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেবল সীমিত পরিসরের কিছু তথ্য জমা দেয়। প্রয়োজনীয় অধিকাংশ নথি এখনও সরবরাহ করা হয়নি। বরং অবশিষ্ট তথ্য দিতে আরও তিন মাস সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। ফলে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা এখন বাকি নথিপত্রের অপেক্ষায় রয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পেছনেও রয়েছে আরেকটি আলোচিত মামলার সূত্র। ঋণ জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলাকালে আলী রেজা ইফতেখারের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
অনুসন্ধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী রেজা ইফতেখারের বিষয়ে ছয় ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি চেয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকে চিঠি পাঠান। এর মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত নথির সত্যায়িত অনুলিপি, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, মোবাইল ও টেলিফোন নম্বর, চাকরিকালীন বেতন-ভাতার হিসাব, তার নামে পরিচালিত সব ব্যাংক হিসাবের তথ্য এবং অবসরকালীন সুবিধাসহ বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের বিবরণ।
প্রথম দফায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নথি জমা না দেওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করে। পরে দুদক সীমিত সময় বাড়িয়ে দিলেও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। এরপরও আবার তিন মাস সময় চেয়ে আবেদন করা হলে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা।
পরবর্তীতে ৮ জুন ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো আরেকটি নোটিশে ১৮ জুনের মধ্যে সব তথ্য ও নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, নির্দেশনা অমান্য করলে দুদক আইনের ১৯(৩) ধারায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সেই চূড়ান্ত সময়সীমা পার হওয়ার পরও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তথ্য গোপন বা সরবরাহে বিলম্বের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে রয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। বর্তমানে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম না থাকায় সেই অনুমোদন পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে আইনগত পদক্ষেপও আপাতত অপেক্ষমাণ রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক খাতে অনিয়ম বা অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে প্রমাণ সংগ্রহ জটিল হয়ে পড়তে পারে এবং বিচারিক প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময়ে বিলম্ব সুশাসনের জন্যও ইতিবাচক বার্তা দেয় না।
আলী রেজা ইফতেখার ২০০৪ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। দুই বছর পর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদোন্নতি পান এবং ২০০৭ সালে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল অবসরে যাওয়ার আগে তিনি দীর্ঘ সময় একই পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং একাধিকবার পুনর্নিয়োগ পান। কর্মজীবনে তিনি ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বও দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি অর্জন করেন।
তবে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহই দুদকের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দ্রুত পাওয়া গেলে অনুসন্ধান নতুন গতি পাবে, আর বিলম্ব অব্যাহত থাকলে আইনি জটিলতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

