বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মূলধনের সংকটে উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে না পারা শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও সচল করতে গঠিত ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন স্কিম বাস্তবায়নে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এ স্কিমের আওতায় অর্থায়ন দিতে আগ্রহী প্রতিটি তফসিলি ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। পাশাপাশি ঋণ বিতরণের আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও নথিপত্র জমা দিতে হবে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-৩ (বিআরপিডি-৩) এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার লেটার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, গত ৪ জুন জারি করা নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় এ নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে কিংবা কার্যকর মূলধনের সংকটে রয়েছে, তাদের পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো।
এ উদ্দেশ্যে তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে তিন বছর মেয়াদি আবর্তনশীল (রিভলভিং) ভিত্তিতে ২০ হাজার কোটি টাকার ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ গঠন করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে যোগ্য শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাবে।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক তার পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন পাওয়ার পর গ্রাহককে ঋণ বা বিনিয়োগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি-৩ বিভাগে নির্ধারিত ছকে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় তথ্য, আর্থিক নথি এবং নির্ধারিত দলিলপত্র সংযুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক-অর্থায়ন অনুমোদন ছাড়া এ স্কিমের আওতায় অর্থ বিতরণ করা যাবে না।
এছাড়া ঋণ গ্রহণ, অর্থ ছাড় এবং ঋণ পরিশোধসংক্রান্ত সব কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় বা প্রিন্সিপাল অফিসের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। এর মাধ্যমে অর্থ বিতরণ ও তদারকি প্রক্রিয়ায় অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন বা সেবা দেওয়ার সক্ষমতার প্রমাণও জমা দিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থপাচার, জালিয়াতি, ঋণের অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়া কিংবা তহবিলের অপব্যবহার করা হবে না—এ মর্মে লিখিত ঘোষণা দিতে হবে। এর পাশাপাশি লেটার অব অথরাইজেশন, ডেবিট অথরিটি, কনটিনিউটি, প্রমিসরি নোট, বিক্রয় বা রাজস্বসংক্রান্ত প্রতিবেদন এবং কারখানা পরিদর্শনের বিষয়ে ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্রসহ প্রয়োজনীয় দলিল জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারী ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের উদ্বৃত্ত তারল্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পৃথক প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। পাশাপাশি স্কিমের সব শর্ত ও নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে—এ মর্মেও লিখিত অঙ্গীকার দিতে হবে।
স্কিমের আওতায় বিতরণ করা ঋণের ব্যবহার, আদায় এবং সার্বিক অগ্রগতি নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য অংশগ্রহণকারী প্রতিটি ব্যাংককে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা তাদের মনোনীত কর্মকর্তার স্বাক্ষরে ঋণ বিতরণ ও আদায়সংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে প্রতি ত্রৈমাসিক শেষ হওয়ার পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি-৩ বিভাগে জমা দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের শিল্প খাতের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে মূলধনের অভাব, উচ্চ সুদ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং বাজার সংকটের কারণে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ বাস্তবতায় বন্ধ শিল্পগুলোকে পুনরায় সচল করতে পরিকল্পিত অর্থায়ন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ঋণ যেন অপব্যবহার বা অন্য খাতে স্থানান্তর না হয়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর তদারকির পথ বেছে নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জারি করা এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। ফলে স্কিমের আওতায় অর্থায়ন দিতে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনার সব শর্ত পূরণ করেই আবেদন ও ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

