দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের বড় অংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে অল্পসংখ্যক উচ্চমূল্যের হিসাবধারীদের হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে জমা থাকা প্রতি ১০০ টাকার প্রায় ৪০ টাকাই রয়েছে কোটিপতি হিসাবগুলোতে।
অন্যদিকে লাখপতি হিসাবধারীদের কাছে রয়েছে আরও প্রায় ৫৬ শতাংশ আমানত। ফলে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের প্রায় ৯৬ শতাংশই রয়েছে লাখপতি ও কোটিপতি হিসাবের নিয়ন্ত্রণে, যদিও মোট হিসাবের বিপুল অংশই সাধারণ গ্রাহকদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ কোটি টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে—এমন হিসাবগুলোতে রয়েছে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। মোট আমানতের হিসাবে এর অংশ ৩৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।
একই সময়ে ১ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকার কম জমা রয়েছে—এমন হিসাবগুলোতে আমানতের পরিমাণ ১২ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ। বিপরীতে ১ টাকা থেকে ৯৯ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা রয়েছে এমন হিসাবগুলোতে রয়েছে মাত্র ৮৯ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা, যা মোট আমানতের প্রায় ৪ শতাংশ।
তবে এই পরিসংখ্যান কেবল ব্যক্তিগত হিসাবের নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি কোম্পানি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যাংক হিসাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে বড় অঙ্কের প্রাতিষ্ঠানিক আমানত সামগ্রিক চিত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৮ কোটি ২৬ লাখ ১২ হাজার ১৫টি। এর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি হিসাবে জমা রয়েছে ১ কোটি টাকা বা তার বেশি। অর্থাৎ মোট হিসাবের ১ শতাংশেরও কম কোটিপতি হিসাব হলেও এসব হিসাবেই রয়েছে মোট আমানতের প্রায় ৪০ শতাংশ।
অন্যদিকে ১ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকার কম জমা রয়েছে ১ কোটি ৯১ লাখ ১৮ হাজার ১৮০টি হিসাবে। আর ১ লাখ টাকার কম জমা রয়েছে ১৬ কোটি ৩৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৫০টি হিসাবে। সংখ্যার দিক থেকে এই ছোট হিসাবগুলোই ব্যাংকিং খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ, কিন্তু অর্থের হিসাবে তাদের অংশ মাত্র ৪ শতাংশ।
সাম্প্রতিক তিন মাসেও নতুন আমানতের বড় অংশ গেছে উচ্চমূল্যের হিসাবগুলোতে। গত ডিসেম্বর শেষে কোটিপতি হিসাবগুলোতে মোট জমা ছিল ৮ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫৯ হাজার ১৬২ কোটি টাকায়। মাত্র তিন মাসে এই শ্রেণির হিসাবে যুক্ত হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা।
একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত বেড়েছে ৫৭ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন যুক্ত হওয়া মোট আমানতের প্রায় অর্ধেকই গেছে কোটিপতি হিসাবগুলোতে। একই সময়ে নতুন ব্যাংক হিসাবও বেড়েছে প্রায় ৪৭ লাখ।
বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতের পরিমাণ অনুযায়ী ব্যাংক হিসাবকে মোট ২৪টি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। এর মধ্যে ১ লাখ টাকার কম আমানতের জন্য রয়েছে পাঁচটি শ্রেণি, ১ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার কম আমানতের জন্য নয়টি এবং ১ কোটি টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানতের জন্য রয়েছে ১০টি শ্রেণি। সব শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা রয়েছে ৫০ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবগুলোতে।
মার্চ শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে এমন হিসাবের সংখ্যা ছিল মাত্র ২ হাজার ৭৪টি। কিন্তু এসব হিসাবে জমা ছিল ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি হিসাবে গড়ে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা করে জমা রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, এই শ্রেণির বড় অংশই শতকোটিপতি ব্যক্তি বা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হিসাব।
ডিসেম্বর থেকে মার্চ—এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধিও হয়েছে এই শ্রেণিতে। ডিসেম্বর শেষে ৫০ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাব ছিল ১ হাজার ৯৯৭টি। মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৪টিতে। একই সময়ে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে ২৪ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।
তবে কোটিপতি হিসাবের সব স্তরে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়নি। ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা, ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা, ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা, ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা জমা রয়েছে—এমন কয়েকটি শ্রেণিতে আমানতের পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে।
ব্যাংকিং খাতের অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের সময় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবকে আলাদা করে দেখা জরুরি। সরকারি সংস্থা, মন্ত্রণালয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্পগোষ্ঠী এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই শত শত কোটি টাকা জমা থাকে। ফলে উচ্চমূল্যের হিসাবগুলোতে আমানতের পরিমাণ অনেক বেশি দেখা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে ব্যক্তি হিসাবের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বড় প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা থাকে। ফলে হিসাবের সংখ্যা সাধারণ মানুষের বেশি হলেও মোট আমানতের বড় অংশ উচ্চমূল্যের হিসাবগুলোতেই কেন্দ্রীভূত হওয়া স্বাভাবিক।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতে, বছরের প্রথম তিন মাসে নির্বাচন এবং পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের প্রবাহ বেড়েছিল। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের প্রতি কিছু আমানতকারীর আস্থাহীনতার কারণে অনেকে ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে অন্য খাতে বিনিয়োগ করেছেন। এরও প্রভাব আমানতের প্রবণতায় পড়েছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হিসাব রয়েছে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা থাকা শ্রেণিতে। মার্চ শেষে এই ধরনের হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৯৩ হাজার ৫১২টি। কিন্তু এসব হিসাবে মোট জমা ছিল মাত্র ৭ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা জমা রয়েছে—এমন হিসাবের সংখ্যা ছিল ৬৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কম।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প আয়ের মানুষ, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা অনেক বেশি হলেও তাঁদের হিসাবে জমার পরিমাণ তুলনামূলক কম। অধিকাংশই বেতন গ্রহণ, দৈনন্দিন লেনদেন বা ছোট পরিসরের সঞ্চয়ের জন্য ব্যাংক ব্যবহার করেন। অন্যদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা থাকায় দেশের মোট ব্যাংক আমানতের বড় অংশ উচ্চমূল্যের হিসাবেই কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে।

