সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর কোনো আমানতকারীর অর্থ কেটে নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সরকার আমানতকারীদের মূল টাকা ও সুদ—দুটিই পরিশোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২১তম কার্যদিবসে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১-এর আওতায় উত্থাপিত জরুরি জন-গুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা ইনশাআল্লাহ তাঁদের অর্থ সুদসহ ফেরত পাবেন। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ‘হেয়ার কাট’ বা আমানতের একটি অংশ কেটে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট ও বড় অঙ্কের লোকসানের মধ্যে থাকায় অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হলো সংকটের ন্যায়সঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করা। সরকার সেই লক্ষ্যেই ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আলোচনার সূচনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থপাচারের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি এবং ব্যাংকের মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, দায়ীদের সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ বাস্তবায়ন করছে। এই আইনের আওতায় সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, একীভূতকরণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য বহুমাত্রিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সংকটে থাকা পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করে নতুন ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে। এই একীভূতকরণের ফলে সংশ্লিষ্ট পাঁচ ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি নতুন প্রতিষ্ঠানের অধীনে সংরক্ষিত রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, আমানতকারীদের সুরক্ষা আরও জোরদার করতে আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ছোট আমানতকারীদের নিরাপত্তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম, জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তে বিশেষ ফরেনসিক নিরীক্ষা চলছে। তদন্ত শেষ হলে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ৫৭ ধারায় দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও আয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রয়োজনে বিক্রি বা নিলামের মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার কার্যক্রমও এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এজন্য শুধু সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের অনিয়ম আর না ঘটে, সে লক্ষ্যে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নোটিশের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের কারণে লাখো আমানতকারী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকেই নিজেদের সঞ্চিত অর্থ তুলতে না পেরে চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা, মেয়ের বিয়ে কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন জোগাড় করতে পারছেন না। ফলে এটি শুধু আর্থিক সংকট নয়, একটি বড় সামাজিক ও মানবিক সংকটেও রূপ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক মালিক বা পরিচালকদের অনিয়মের দায় কোনোভাবেই সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানো উচিত নয়। তাই ‘হেয়ার কাট’ নীতির মতো কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সংসদে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল যে, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে মূলধনের কোনো অংশ কেটে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। তবে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করেই অর্থ পরিশোধের সময়সূচি নির্ধারিত হবে।

