সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা কঠোর বিধিনিষেধের কারণে নিজেদের জমা অর্থ তুলতে নানা জটিলতার মুখে পড়লেও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে থাকা তাঁর হিসাব থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের বিশেষ অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর ব্যাংকিং খাতে সমতা, নীতিমালা প্রয়োগ এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি চিকিৎসা ও পারিবারিক ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখায় থাকা নিজের হিসাব থেকে ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমতি চান। আবেদন পর্যালোচনার পর গত ১৬ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাঁকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমোদন দেয়।
এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিম-২০২৫-এর ২১ ধারার আওতায়। ওই ধারায় বিশেষ পরিস্থিতিতে স্কিমের নির্ধারিত বিধান শিথিল বা সংশোধনের ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রাষ্ট্রপতি চিকিৎসাসংক্রান্ত ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থ উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন। সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংকের আমানত পরিশোধের জন্য নির্ধারিত রেজল্যুশন স্কিম কার্যকর থাকলেও রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক পদমর্যাদা ও বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় তাঁকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, শুধু রাষ্ট্রপতিই নন, বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় আরও কয়েকজন আমানতকারীকে একই ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের পরিচয় বা কী ধরনের পরিস্থিতিকে বিশেষ বিবেচনা করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
বর্তমানে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের একটি, যেগুলো পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে। অন্য চারটি ব্যাংক হলো এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংককে একীভূত করে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের কার্যক্রম চলছে।
চলমান রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী, আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা অনুসারে। যেসব হিসাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা রয়েছে, সেসব আমানতকারী বিধিনিষেধ ছাড়াই পুরো অর্থ তুলতে পারেন। এছাড়া ক্যানসার রোগী, ডায়ালাইসিস প্রয়োজন এমন রোগীসহ কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির গ্রাহক আমানতের পরিমাণ নির্বিশেষে প্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পান।
অগ্রাধিকার তালিকায় আরও রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, প্রভিডেন্ট ও গ্র্যাচুইটি তহবিল, বহুজাতিক কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি কূটনৈতিক মিশন।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির আবেদনটি রেজল্যুশন স্কিমে নির্ধারিত কোনো অগ্রাধিকার শ্রেণির মধ্যে না পড়ায় গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক বিষয়টি সিদ্ধান্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আংশিক অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দেয়।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত গুরুতর চিকিৎসা, কিডনি প্রতিস্থাপন, ডায়ালাইসিস, ক্যানসারের চিকিৎসা, বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যয় কিংবা মানবিক বিবেচনায় নির্ধারিত সীমার বেশি অর্থ উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে প্রবীণ নাগরিকদেরও যাচাই-বাছাই শেষে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তবে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক মো. মোকসুদুজ্জামান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, অনুমোদন পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ওই অর্থ উত্তোলন করেননি।
এদিকে রাষ্ট্রপতির জন্য বিশেষ অনুমতির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অনেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় অর্থ তুলতে না পেরে চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে সংকটে রয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে একই নীতিমালার আওতায় রাষ্ট্রপতির জন্য ব্যতিক্রমী অনুমোদন দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অবশ্য লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছেন, তাঁর আবেদনে কর পরিশোধ বা ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। আবেদনটি করা হয়েছিল পারিবারিক ব্যয়, ব্যক্তিগত প্রয়োজন, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা এবং ঈদুল আজহার ব্যয় নির্বাহের জন্য।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির (বেতন ও বিশেষাধিকার) আইন, ১৯৭৫ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর সঙ্গে বসবাসকারী ও সম্পূর্ণভাবে তাঁর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা সরকারি খরচে চিকিৎসাসেবা পেলেও অন্য আত্মীয়রা এই সুবিধার আওতায় পড়েন না।
রাষ্ট্রপতি আরও জানান, তাঁর ছোট বোন এবং ছোট ভাইয়ের স্ত্রী বর্তমানে ভারতের চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন। তাঁদের একজন লিভার সিরোসিস এবং অন্যজন মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের জন্য চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো নিজের দায়িত্ব বলেই তিনি আবেদন করেছিলেন। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ৮ জুলাই পর্যন্ত আবেদন করা অর্থের কোনো অংশই তাঁর হিসাবে ছাড় করা হয়নি।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন চলাকালে নীতিমালার প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও সমতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ আইনেই থাকলেও কোন পরিস্থিতিতে এবং কী মানদণ্ডে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকলে জনআস্থা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ আমানতকারীদের ভোগান্তি কমিয়ে দ্রুত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করাও এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ।

