১ জুলাই থেকে দেশের সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট পয়েন্টে সর্বজনীন বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়ার পর ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় নতুন গতি এলেও এর সঙ্গে নির্ধারিত মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকান মালিক এবং অনেক ভোক্তার অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপরই পড়বে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এটি কোনো অতিরিক্ত বোঝা নয়; বরং একটি আধুনিক, নিরাপদ ও দক্ষ ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ।
দেশে নগদবিহীন লেনদেন সম্প্রসারণ, একাধিক কিউআর কোডের পরিবর্তে একক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক লেনদেনকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বজনীন বাংলা কিউআর ব্যবস্থা চালু করেছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে একটি মাত্র বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমেই যেকোনো ব্যাংক কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করা যাবে। ফলে একই দোকানে আলাদা আলাদা কিউআর কোড ব্যবহারের প্রয়োজন থাকবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর কোড থাকবে না, ভবিষ্যতে তাদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রেও জটিলতা দেখা দিতে পারে। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য এই ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে।
তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলা কিউআর ব্যবহার করে লেনদেনের ক্ষেত্রে ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ এমডিআর নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, এই অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হবে না। অর্থাৎ একজন ক্রেতা যে পরিমাণ টাকা পরিশোধ করবেন, তার অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিক সেই পরিমাণ অর্থই কাটা হবে। কিন্তু ব্যবসায়ী যে অর্থ পাওয়ার কথা, তার মধ্য থেকেই নির্ধারিত সেবা ফি কেটে রাখা হবে।
সহজভাবে বলতে গেলে, একজন ক্রেতা যদি বাংলা কিউআর ব্যবহার করে এক হাজার টাকার পণ্য কেনেন, তাহলে তার অ্যাকাউন্ট থেকে কাটা হবে এক হাজার টাকাই। কিন্তু ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্টে জমা হবে প্রায় ৯৯০ টাকা। অবশিষ্ট প্রায় ১০ টাকা ভ্যাটসহ এমডিআর হিসেবে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করবে।
এই নীতির পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় করতে হলে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উল্টো তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, তিনি আগে যে বাংলা কিউআর ব্যবহার করতেন, সেখানে সর্বনিম্ন চার্জ ছিল ৭ টাকা। কিন্তু নতুন নির্দেশনার পর তা বেড়ে ১০ টাকায় পৌঁছেছে। তার ভাষায়, চার্জ কমানোর প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা বেড়েছে, যা ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
চকবাজারের এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, প্রযুক্তিগতভাবে চাইলে ব্যাংকগুলো বিনা খরচেও কিউআর সেবা দিতে পারে। অথচ নতুন নীতিমালার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বের তুলনায় চার্জ বাড়ানো হয়েছে। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে বাজারে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অনেকের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
আরেক ব্যবসায়ী বায়েজিদ আহমেদের মতে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুনাফার হার এমনিতেই সীমিত। সেখানে ১ শতাংশ চার্জ বাধ্যতামূলক করা হলে অনেকেই ডিজিটাল লেনদেনে আগ্রহ হারাবেন। তিনি মনে করেন, নগদবিহীন অর্থনীতি গড়তে হলে কিউআর এবং পয়েন্ট অব সেল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ চার্জমুক্ত করা উচিত। পাশাপাশি মোবাইল ডাটার খরচ কমানো এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা দূর করারও প্রয়োজন রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, নগদ অর্থ ব্যবহার কমাতে সরকার উৎসাহ দিলেও কেন সেই ব্যবস্থার জন্য ব্যবসায়ীদের অর্থ দিতে হবে।
ফারহান সিদ্দিক রিফাত নামে একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, টাকা খরচ করার জন্য আলাদা খরচ নেওয়ার যৌক্তিকতা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে না। অন্যদিকে গোলাম মোস্তফা বলেন, আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় কিউআরভিত্তিক লেনদেনে কোনো চার্জ নেই। তাহলে বাংলাদেশে কেন এমন ব্যয় বহন করতে হবে, সেটি ব্যাখ্যা করা দরকার।
আরিফুর রহমান মনে করেন, কিউআরভিত্তিক লেনদেনের ফলে আয়-ব্যয়ের তথ্য আরও স্বচ্ছ হবে এবং কর ফাঁকি কমবে। কিন্তু ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে হলে ইন্টারনেট এবং লেনদেন উভয় ক্ষেত্রেই খরচ কমানো জরুরি। অন্যথায় অনেক মানুষ এই পদ্ধতি এড়িয়ে যেতে পারেন।
আব্দুল করিম নামে আরেকজন ব্যবহারকারী হিসাব তুলে ধরে বলেন, নগদ টাকার ব্যবহার কমলে নতুন নোট ছাপানো ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে। তাই সেই সুবিধার একটি অংশ ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হলে ডিজিটাল লেনদেন আরও দ্রুত জনপ্রিয় হতে পারত।
ভোক্তাদের একটি বড় অংশের আশঙ্কা, ব্যবসায়ীরা নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত এই অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার সাধারণ ক্রেতার কাঁধেই গিয়ে পড়বে। তাদের মতে, সরকার যেহেতু ডিজিটাল অর্থনীতির মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক নজরদারিতে বেশি সুবিধা পাবে, তাই অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের ওপর কোনো চার্জ না রাখাই যুক্তিযুক্ত হতো।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, দেশে অতীতেও ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টার এবং ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। তাই নতুন ব্যবস্থাকে সফল করতে হলে শুরু থেকেই বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ করা দরকার। তার মতে, ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রতি হাজার টাকায় ১০ টাকা কাটা হলে অনেকেই বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেবেন।
বাংলাদেশ দোকান মালিক ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. নাজমুল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশের লাখো দোকানির কাছ থেকে এই চার্জ কাটা হলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হবে। তিনি এমডিআর পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার চাইলে বিকল্প উপায়ে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারে।
তবে এসব সমালোচনার সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এমডিআর একটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত কাঠামো। এটি শুধু লেনদেন পরিচালনার ব্যয়ই বহন করে না, বরং নিরাপদ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দ্রুত অর্থ নিষ্পত্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও বলছে, নগদ টাকার ব্যবহার কমলে নোট ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা এবং নগদ ব্যবস্থাপনার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে, করের আওতা সম্প্রসারিত হবে এবং অর্থপাচার ও কর ফাঁকির সুযোগও সীমিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল ব্যবসায়ী, ভোক্তা এবং রাষ্ট্র—সবার কাছেই পৌঁছাবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, নতুন প্রযুক্তি চালুর শুরুতে মানুষের মধ্যে অনীহা থাকাটা স্বাভাবিক। অতীতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ এর সুবিধা বুঝেছে এবং এখন কার্ডভিত্তিক লেনদেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তার মতে, বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফর হোসেন খান জানান, বর্তমানে নির্ধারিত ১ শতাংশ এমডিআর স্থায়ী কোনো হার নয়। ভবিষ্যতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার এবং লেনদেনের পরিমাণ বাড়লে, পাশাপাশি ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ও পেমেন্ট সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেলে পরিচালন ব্যয় কমে আসবে। তখন এমডিআরের হারও ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
তার ভাষায়, বর্তমান পর্যায়ে এই ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। তাৎক্ষণিক অসন্তোষের পরিবর্তে নিরাপদ, দ্রুত এবং আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার সুফল বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি মনে করেন, নতুন প্রযুক্তি চালুর প্রথম ধাপে রাজস্ব আদায়ের পরিবর্তে ব্যবহারকারী বাড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তার মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে এমডিআর ১ শতাংশের বদলে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হলে লাখো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সহজে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী হতেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল লেনদেনে রূপান্তর কোনো স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া নয়। মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কম খরচের অবকাঠামো, দ্রুত ইন্টারনেট এবং ব্যবহারবান্ধব নীতিমালাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলা কিউআর সফল করতে হলে ব্যবসায়ী, ভোক্তা, ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি এমডিআর কাঠামো নিয়েও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

