ক্ষুদ্র ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে এই ঋণ অনুমোদন করেছে।
তবে অর্থ ছাড়ের আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সার্বভৌম গ্যারান্টি প্রয়োজন হওয়ায় তা চেয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে আবেদন করেছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অর্থায়ন বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
পিকেএসএফ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ জুন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের কাছে সার্বভৌম গ্যারান্টি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক পিকেএসএফকে ৫ হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদের ঋণ অনুমোদন করেছে।
এই অর্থ দিয়ে ‘কুটির ও মাইক্রো খাতের উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য বিশেষ তহবিল’ গঠন করা হবে। ওই তহবিলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হবে, যাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সহায়তা করা যায়।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী, ঋণের মূল অর্থ এবং সুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সার্বভৌম গ্যারান্টি বাধ্যতামূলক। এ কারণে অর্থ ছাড়ের আগে সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অতীতেও পিকেএসএফের বিভিন্ন ঋণের বিপরীতে সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়েছে। এবারও একই ধরনের অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে গত ২ জুন জারি করা নতুন নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত এবং সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ঋণের বিপরীতে সরকার গ্যারান্টি দিলে ঋণের বিপরীতে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে গ্যারান্টি ফি দিতে হবে। এই অর্থ এককালীন সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া এই অর্থ ‘সোপান’ নামে একটি কর্মসূচির আওতায় মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
তার ভাষায়, ক্ষুদ্রঋণের উদ্দেশ্য শুধু দারিদ্র্য বিমোচন নয়; বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। ‘সোপান’ কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন বাড়ানো, নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদের আর্থিক সক্ষমতা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়ানো হবে।
ভবিষ্যতে এই তহবিলের আকার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তার মতে, বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নের মাধ্যমে এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে চায় পিকেএসএফ। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তহবিলের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি কিংবা ২০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
জানা গেছে, পাঁচ বছর মেয়াদি এই ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক পিকেএসএফের কাছ থেকে ৩ শতাংশ সুদ নেবে।
পিকেএসএফ ওই অর্থ ৭ শতাংশ সুদে তাদের সহযোগী সংস্থা বা অংশীদার সংগঠনগুলোর কাছে বিতরণ করবে। এরপর মাঠপর্যায়ে এসব সংস্থা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করবে। চূড়ান্ত গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ১৮ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
পিকেএসএফ জানিয়েছে, ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ক্ষুদ্রঋণ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছে। অতীতে বিদেশি ও দেশীয় বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতেও সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দিয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে সব ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। সরকারি গ্যারান্টির বিপরীতে কোনো খেলাপির ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।
ফজলুল কাদের বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই তহবিলের অর্থ এমন খাতে বিনিয়োগ করা হবে, যেখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবেন।
তিনি বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলেন, দেশে ক্ষুদ্র ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। ফলে এই খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
পিকেএসএফের নিজস্ব বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাইক্রো খাতে সরাসরি দুইজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট সরবরাহ ও সেবাখাতে গড়ে আরও সাড়ে তিনজনের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে এই তহবিল শুধু উদ্যোক্তা তৈরিই নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

