ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ঋণের একটি অংশ দ্রুত আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধা চালু করেছে। উদ্দেশ্য ছিল—যেসব ঋণগ্রহীতা একবারে বকেয়া পরিশোধ করতে সক্ষম, তাদের জন্য একটি সহজ সমাধানের পথ তৈরি করা। কিন্তু নীতিমালা ঘোষণার প্রায় দুই সপ্তাহ পরও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনেক ব্যবসায়ী এখনো এই সুবিধা কার্যকরভাবে পাচ্ছেন না, আর বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংকও বিষয়টি নিয়ে দৃশ্যমান আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার—উভয় পক্ষের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কেবল একটি নীতিমালা ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি, আর্থিক এবং পরিচালনাগত বেশ কিছু জটিলতা সামনে চলে এসেছে, যা এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
গত ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, ৩০ জুন ২০২৬ ভিত্তি তারিখ অনুযায়ী মন্দ ও ক্ষতিজনক শ্রেণিতে থাকা ঋণ এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধার আওতায় আনা যাবে। তবে এই সুবিধা পাওয়া সম্পূর্ণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং গ্রাহকের সঙ্গে ব্যাংকের বিদ্যমান সম্পর্কের ওপর। যোগ্য ঋণগ্রহীতাকে একবারেই পুরো বকেয়া পরিশোধ করতে হবে এবং প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
তবে এই সুবিধার ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত যেসব ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, সেগুলো এই নীতিমালার বাইরে থাকবে। একইভাবে স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের ঋণও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত নয়।
নীতিমালার মূল লক্ষ্য ছিল ব্যাংকের আটকে থাকা অর্থ দ্রুত উদ্ধার করা, যাতে খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা কমে এবং ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ বিতরণে সক্ষম হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক বেসরকারি ব্যাংক এখনো আবেদন গ্রহণ কিংবা সুদ মওকুফের মতো বিষয়গুলোতে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
ব্যাংকগুলোর যুক্তি হলো, দীর্ঘদিন ধরে ঋণের ওপর যে সুদ যোগ হয়েছে, তার বড় অংশ ইতোমধ্যেই আয় হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে। সেই আয়ের ওপর সরকারকে কর পরিশোধ করা হয়েছে, আবার শেয়ারধারীদের লভ্যাংশও দেওয়া হয়েছে। ফলে এখন সেই সুদ মওকুফ করলে ব্যাংকের আর্থিক হিসাব ও মূলধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণেই অনেক ব্যাংক ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
আরও একটি বিষয় ব্যাংকগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তারা মনে করছে, কোনো গ্রাহককে এই সুবিধা দেওয়ার আগে তার আর্থিক সক্ষমতা, নথিপত্র এবং ঋণের প্রকৃত অবস্থা ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ ধরনের যাচাইয়ের নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগোচ্ছে না।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সমস্যার মূল জায়গা অন্যত্র। যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর বন্ধ রয়েছে, তাদের অধিকাংশ মালিকের হাতে এককালীন ঋণ পরিশোধ করার মতো অর্থই নেই। যদি সেই সামর্থ্য থাকত, তাহলে তারা অনেক আগেই নিজেদের কারখানা চালু করতেন। তাই শুধু ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ দিলেই বাস্তব সংকট কাটবে না।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন অর্থায়ন। কারণ উৎপাদন শুরু না হলে কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় হবে না, আর আয় না থাকলে পুরোনো ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও তৈরি হবে না। অর্থাৎ নতুন মূলধন ছাড়া পুরোনো ঋণ আদায়ের আশা বাস্তবসম্মত নয়।
শিল্প পুলিশ এবং উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, গত দুই বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থায়নের অভাবে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শ্রমবাজারে। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অন্যান্য খাতের হিসাব যোগ করলে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বন্ধ ও সংকটে থাকা শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফেরাতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রাক-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে। ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে পরিচালিত এই তহবিলের লক্ষ্য হলো কার্যকর মূলধনের সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন ঋণ দেওয়া, যাতে তারা পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে পারে।
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর মতে, এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তিনি বলেন, বন্ধ কারখানার মালিকদের হাতে যদি পর্যাপ্ত অর্থ থাকত, তাহলে তারা আগে নিজেদের কারখানাই চালু করতেন। তাই ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল থেকে সহজ শর্তে নতুন ঋণ দেওয়াই হবে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ। এতে একদিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও ধীরে ধীরে আদায় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন এলে যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নীতিমালায় যেভাবে এককালীন পরিশোধের কথা বলা হয়েছে, ব্যাংক সেই নিয়মই অনুসরণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই যোগ্য গ্রাহক যেন এই সুবিধা পান। পাশাপাশি যেসব উদ্যোক্তা বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করতে চান, তারা ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল থেকেও ঋণ নিতে পারবেন। প্রয়োজনে নীতিমালার বাস্তবায়নও বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষণ করবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, আটকে থাকা ঋণের অর্থ উদ্ধার, ব্যাংক খাতে তারল্য বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণসংক্রান্ত মামলার চাপ কমাতে এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু নীতিগত ও ব্যবহারিক অস্পষ্টতা রয়েছে। এসব বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া গেলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হতে পারে।
সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বলছে, এককালীন ‘এক্সিট’ সুবিধা খেলাপি ঋণ কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটি একা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। দেশের শত শত বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে সহজ শর্তে নতুন অর্থায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। কারণ শিল্প সচল হলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, উদ্যোক্তাদের আয় ফিরবে এবং শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আটকে থাকা ঋণও আদায়ের পথ সহজ হবে। অর্থাৎ ঋণ আদায় ও শিল্প পুনরুজ্জীবন—দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

