দেশে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আর্থিক লেনদেনের নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) জমা পড়েছে ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি। এসব প্রতিবেদনের প্রায় ৯৫ শতাংশই এসেছে ব্যাংক খাত থেকে, যা আর্থিক খাতে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রক তদারকি বৃদ্ধির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএফআইইউ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, চলতি প্রতিবেদনের মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের প্রতিবেদন (এসএআর)।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিএফআইইউতে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫টি সন্দেহজনক প্রতিবেদন জমা পড়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে পৌঁছেছে। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি প্রতিবেদন জমা পড়েছিল, সেখানে চার বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫) এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সব রিপোর্টিং সংস্থার জন্য সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের তথ্য বিএফআইইউতে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিলম্ব না করে তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয়।
বিএফআইইউর বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, সন্দেহজনক প্রতিবেদন বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি, আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শনাক্তে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা বৃদ্ধি।
এছাড়া অনলাইন জুয়া ও বাজি, বৈদেশিক মুদ্রার অনিয়মিত লেনদেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার এবং ডিজিটাল হুন্ডির মতো নতুন ধরনের আর্থিক ঝুঁকির কারণে নজরদারির পরিধিও সম্প্রসারিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিলে ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে এগিয়ে। গত তিন অর্থবছর ধরেই মোট প্রতিবেদনের ৯০ শতাংশের বেশি এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৯১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
সর্বশেষ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো ২৮ হাজার ৭৫৫টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ৯৯১টি। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংক খাতের জমা দেওয়া প্রতিবেদনের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১২ হাজার ৮০৯টি প্রতিবেদনের তুলনায় এটি দ্বিগুণেরও বেশি।
বিএফআইইউর মতে, ব্যাংকগুলোর উন্নত লেনদেন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শক্তিশালী হওয়ার ফলেই সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত ও প্রতিবেদন দাখিলের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে, ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও প্রতিবেদনের সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ২৫০টি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১২১টি। একই সময়ে অর্থ প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদন ৯০০টি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৫টিতে পৌঁছেছে। তবে মোট প্রতিবেদনের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের অংশ যথাক্রমে প্রায় ১ শতাংশ এবং ৪ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন বেড়ে যাওয়া মানেই অর্থপাচার বেড়েছে—এমনটি নয়। বরং আর্থিক খাতে নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার, আইন প্রয়োগ এবং রিপোর্টিং সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়ার কারণে আগে শনাক্ত না হওয়া অনেক লেনদেন এখন পর্যবেক্ষণের আওতায় আসছে। এর ফলে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দেশের সক্ষমতা আরও জোরদার হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

