দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। এমন পরিস্থিতিতেই নীতি সুদহার বা রেপো রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। আগামী রোববার থেকে এটি কার্যকর হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আন্তঃব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের বিপরীতে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) সুদহার আগের মতোই ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে।
রেপো রেট সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ১০ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং এরপর থেকে তা অপরিবর্তিত ছিল।
মূল্যস্ফীতি কমেনি, তবু সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত এমন সময় এসেছে, যখন দেশের মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। মে মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং এপ্রিল মাসে ছিল ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
সরকার চলতি অর্থবছর শেষে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে আগের অর্থবছরেও একই ধরনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নীতি সুদহার তুলনামূলক বেশি রাখে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. মোস্তাকুর রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি নীতি সুদহার পর্যালোচনার উদ্যোগ নিলেও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হয়।
এরপর ৩০ জুন প্রকাশিত চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আপাতত সুদহার কমানো হবে না। তবে এক মাসের ব্যবধানে সেই অবস্থান পরিবর্তন করে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
অন্যদিকে, সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্বে থাকাকালে জানিয়েছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতি সুদহার কমানো হবে না। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি দায়িত্বে থাকলে বরং নীতি সুদহার ১২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পক্ষে থাকতেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যসহ বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনার পর মুদ্রানীতি কমিটি নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কামাল মুজেরী, বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফিরদৌসি নাহার, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আকতার হোসেন এবং নির্বাহী পরিচালক ড. ইমাম আবু সাঈদ অংশ নেন।
চলতি মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে জুন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে মে মাস পর্যন্ত প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
এদিকে কম সুদে ঋণ বিতরণের উদ্দেশ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

