বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদের হার এখন আর শুধু ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, ব্যবসার ব্যয়, ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এখন অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি ফেরাতে কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান বা ‘ইন্টারমিডিয়েশন স্প্রেড’ সর্বোচ্চ ৪ শতাংশীয় পয়েন্টে সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সুদের হার কমলেই বিনিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে—বর্তমান বাস্তবতা এমন সরল সমীকরণ দিচ্ছে না। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জুন ২০২৬ শেষে উদ্বৃত্ত তারল্য ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। অর্থাৎ ব্যাংকে অর্থের অভাব নেই; সংকট মূলত সেই অর্থের উৎপাদনশীল ব্যবহার এবং নতুন ঋণের চাহিদায়।
এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। উদ্যোক্তারা উচ্চ সুদের পাশাপাশি দুর্বল চাহিদা, জ্বালানি সংকট, বিনিময় হারের অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক ঝুঁকি বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকটের কারণে আগের মতো ঝুঁকি নিয়ে ঋণ বিতরণে আগ্রহী নয়। ফলে সুদের হার কমানোর সঙ্গে ব্যাংক সংস্কারের সম্পর্ক এখন সরাসরি।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত দুই বছরে ধাপে ধাপে নীতি সুদহার বাড়িয়ে একপর্যায়ে রেপো রেট ১০ শতাংশে উন্নীত করেছিল। এর ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বেড়ে যায় এবং ঋণের সুদহারও বাড়তে থাকে। সাধারণ ব্যবসায়িক ও শিল্পঋণের সুদহার অনেক ক্ষেত্রে ১৪ থেকে ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। সব সাধারণ বা বড় শিল্পঋণে ১৭-১৮ শতাংশ সুদহারকে স্বাভাবিক হার বলা ঠিক নয়; তবে উচ্চঝুঁকির ঋণ, কিছু এসএমই অর্থায়ন, এনবিএফআই এবং বিভিন্ন ফি ও মাশুল যুক্ত হলে প্রকৃত অর্থায়ন ব্যয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৬-১৭ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে।
উচ্চ অর্থায়ন ব্যয় উদ্যোক্তাদের নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, মূলধনী যন্ত্রপাতি কেনা কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তোলে। কোনো প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা যদি ঋণের খরচের তুলনায় কমে যায়, উদ্যোক্তার পক্ষে বিনিয়োগ স্থগিত রাখাই স্বাভাবিক। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা দুটিই দুর্বল হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনে। বর্তমানে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২৭ আগস্ট আন্তঃব্যাংক কলমানি বাজারের গড় সুদহার ছিল ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মুদ্রাবাজারে নীতি সুদহারের পরিবর্তনের প্রভাব দেখা গেলেও তা এখনো ঋণগ্রহীতার কাছে পুরোপুরি পৌঁছেনি।
জুন ২০২৬-এ ব্যাংকগুলোর গড় আমানত সুদহার ছিল ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং গড় ঋণ সুদহার ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ফলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্ট। অথচ ২৯ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তা অর্থায়ন ছাড়া অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে weighted average lending-deposit spread সর্বোচ্চ ৪ শতাংশীয় পয়েন্টে সীমিত করার নির্দেশ দেয়।
এটি শুধু সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নয়; ব্যাংকগুলোর ঋণমূল্য নির্ধারণের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য হলো ব্যাংক ও আমানতকারীর স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে ব্যবসা ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
তবে এ নির্দেশনার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে সব ব্যাংকে একইভাবে দেখা যাবে না। অনেক ব্যাংকের পুরোনো আমানত উচ্চ সুদে সংগ্রহ করা, ফলে তাদের তহবিল ব্যয় রাতারাতি কমবে না। এ কারণে ব্যাংকারদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ৪ শতাংশের সীমায় তাৎক্ষণিকভাবে নামা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে এসএমই ঋণে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এ খাতে স্প্রেড সীমার প্রভাব নিয়ে ব্যাংকারদের উদ্বেগ রয়েছে।
জুলাই ২০২৬-এ ব্যাংকগুলোর গড় ঋণ সুদহার ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশে নেমে এসেছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একই সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। ফলে নামমাত্র ঋণ সুদ কমলেও বাস্তব অর্থায়ন ব্যয় এখনো উদ্যোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য।
ব্যাংকে অর্থ আছে, কিন্তু বিনিয়োগের চাহিদা কোথায়? বাংলাদেশের বর্তমান ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো বিপুল তারল্য এবং দুর্বল ঋণচাহিদার সহাবস্থান। জুন ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মে মাসের প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা থেকে উল্লেখযোগ্য বেশি। অথচ জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে আসে।
মে মাসেও বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এক বছর আগে একই সময়ে তা ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। ফলে ব্যাংকে আমানত ও তারল্য বাড়লেও ব্যবসা ও শিল্প খাতে নতুন ঋণের চাহিদা বাড়ছে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জুনের ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ ঋণপ্রবৃদ্ধিকে শুধু নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ওই মাসের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ঋণ সম্প্রসারণের লক্ষ্য ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে প্রকৃত অর্থে এটি শুধু ‘লক্ষ্যমাত্রার নিচে’ নয়, দীর্ঘ সময়ের তুলনায় একটি গভীর ঋণচাহিদা সংকেতও বহন করছে।
বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর মূল্যায়নেও বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছিল এবং দুর্বল বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, চাপগ্রস্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেছিল।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রভাব, অপর্যাপ্ত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বড় আকার ধারণ করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং খাতের NPL ratio বা খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সঙ্গে ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার capital-to-risk-weighted-assets ratio ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যায়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, classified/defaulted loans-এর পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা এবং এর অনুপাত ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এই দুই সংখ্যার মধ্যে সামান্য পার্থক্যের কারণ হলো প্রতিবেদনের সংজ্ঞা ও পরিমাপের পদ্ধতি ভিন্ন। তাই এগুলোকে একই সূচক হিসেবে ব্যবহার না করে আলাদাভাবে উপস্থাপন করাই সঠিক।
এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোকে শুধু কম সুদে ঋণ দিতে চাপ দিলে বিপরীত ফল হতে পারে। দুর্বল ব্যাংক যদি পর্যাপ্ত ঝুঁকি যাচাই ছাড়াই ঋণ বিতরণ করে, তাহলে বর্তমান বিনিয়োগই ভবিষ্যতের নতুন খেলাপি ঋণে পরিণত হতে পারে। সুতরাং ব্যাংক সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘যত বেশি ঋণ’ নয়, বরং ‘যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনশীল ঋণ’।
২০২৬-২০৩১ মেয়াদের Five-Year Strategic Framework for Reform and Development-এ ব্যাংকিং খাতসহ অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারের জন্য তিন পর্যায়ের কৌশল নেওয়া হয়েছে—প্রথম বছরে তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, পরবর্তী এক থেকে তিন বছরে পুনর্গঠন এবং তিন থেকে পাঁচ বছরে গভীর কাঠামোগত সংস্কার।
প্রথম পর্যায়ে উচ্চঝুঁকির ব্যাংকের ওপর কঠোর তদারকি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, আমানতকারীর সুরক্ষা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় fit-and-proper মানদণ্ড জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রয়োজন অনুযায়ী একীভূতকরণ এবং মূলধন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে শক্তিশালী সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে।
এই সংস্কারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তাও যুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক জুন ২০২৬-এ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। এর আওতায় আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামো উন্নত করা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার এবং জরুরি তারল্য সহায়তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে।
আইএমএফের মূল্যায়নেও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়েছে। Bank Resolution Ordinance 2025-এর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংক সমাধানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং risk-based supervision জোরদার করা হয়েছে।
সংস্কারের স্বল্পমেয়াদি প্রভাব অবশ্য কঠিন হতে পারে। কোনো ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতি ও মূলধন ঘাটতি প্রকাশ পেলে সাময়িকভাবে তার ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই স্বচ্ছতাই ব্যাংকের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সুস্থ ঋণপ্রবাহ প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করবে।
শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু ঋণের সুদ কমানো যথেষ্ট নয়। নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গ্যাস-বিদ্যুৎ, বন্দর, পরিবহন, আমদানি প্রক্রিয়া এবং উৎপাদন সক্ষমতার নিশ্চয়তা।
বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি সংকট, শিল্প উৎপাদনের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কথাও ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা উল্লেখ করছেন।
কোনো উদ্যোক্তা যদি নিশ্চিত না হন যে বিনিয়োগের পর তার কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখতে পারবেন, তাহলে কম সুদের ঋণও তাকে বড় প্রকল্পে যেতে উৎসাহিত করবে না। ফলে মুদ্রানীতির সঙ্গে জ্বালানি ও অবকাঠামো নীতির সমন্বয় এখন অপরিহার্য।
আমদানিনির্ভর শিল্পের জন্য বিনিময় হার এখন বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের অন্যতম বড় অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট ২০২৬-এ আন্তঃব্যাংক বাজারে USD/BDT-এর bid-ask range ছিল ১২২ দশমিক ৯৯ থেকে ১২৩ টাকা এবং weighted average rate ছিল ১২২ দশমিক ৯৯৫৯ টাকা। একই দিনে ৫টা পর্যন্ত FX spot reference rate ছিল ১২৩ দশমিক ০৭০৭ টাকা। আগস্টের শুরুতে ও মাঝামাঝি সময়ে এই reference rate ১২৩ দশমিক ৭-১২৩ দশমিক ৯ টাকার কাছাকাছিও উঠেছিল।
ফলে আমদানিকৃত কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প উপকরণের জন্য উদ্যোক্তাদের বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। শুধু বর্তমান বিনিময় হার নয়, ভবিষ্যতে ডলারের দর কোন পর্যায়ে থাকবে—এই অনিশ্চয়তাও নতুন প্রকল্পের হিসাবকে কঠিন করে তুলছে। অর্থাৎ বিনিয়োগের পরিবেশ স্বাভাবিক করতে শুধু সুদের হার কমানো যথেষ্ট নয়; বিনিময় হারকেও তুলনামূলক স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য রাখতে হবে।
দুর্বল বাজারচাহিদা বিনিয়োগকে আরও আটকে দিচ্ছে। জুলাই ২০২৬-এ দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এলেও তা এখনো উচ্চ। জুনে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, জুলাইয়ে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় মূল্যস্ফীতিই কমেছে।
মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা ইতিবাচক হলেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর দীর্ঘদিনের চাপের কারণে বাজারের চাহিদা এখনো দুর্বল। ফলে উদ্যোক্তার সামনে একই সঙ্গে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অনিশ্চিত বিক্রির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় সুদ কমলেও নতুন বিনিয়োগে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা অপেক্ষাকৃত সতর্ক থাকতেই পারেন।
সুদের হার কমার সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল পাওয়ার কথা কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা CMSME খাতে। ঋণের সুদ ১৭-১৮ শতাংশের উচ্চ কার্যকর ব্যয় থেকে ১৪-১৫ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এলে অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তার প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে।
কিন্তু এখানেও বড় সমস্যা হলো জামানত ও ঋণপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া। বড় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, আর্থিক হিসাব ও ঋণ ইতিহাস থাকায় ব্যাংক তাদের ঋণ দিতে তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অনেক ছোট উদ্যোক্তার পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় তারা ব্যাংক অর্থায়ন থেকে বাদ পড়ে যান।
তাই এসএমই বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু সুদের হার কমানো নয়, credit guarantee, বিকল্প জামানত, সহজ নথিপত্র এবং ডিজিটাল credit assessment-এর মতো ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় নীতি সুদ কমলেও তার সুফল বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি থাকবে।
সুদের হার কমার প্রভাব ব্যাংকঋণের বাইরে পুঁজিবাজারেও পড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ব্যাংকের এফডিআর এবং সরকারি বন্ডে তুলনামূলক আকর্ষণীয় রিটার্ন থাকায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ারবাজারের পরিবর্তে নিশ্চিত আয়ের ফিক্সড-ইনকাম বিনিয়োগকে বেছে নিয়েছেন।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অতিরিক্ত তারল্যের কারণে আগস্টে ৯১ দিনের ট্রেজারি বিলের ইল্ড ৯ শতাংশের নিচে নেমে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশে এসেছিল। ফলে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজের রিটার্ন কমতে থাকলে তুলনামূলক বেশি রিটার্নের সন্ধানে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থের একটি অংশ পুঁজিবাজারে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি, স্বচ্ছতা, করপোরেট সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের পাশাপাশি গভীর পুঁজিবাজার গড়ে উঠলে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ বাড়বে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল হওয়ায় ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে অর্থ বিনিয়োগ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়ালে একই ব্যাংকিং তহবিলের জন্য সরকার ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
এর ফলে সুদের হার বাড়ার এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়—যাকে অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়। তাই সরকারের ঘাটতি অর্থায়নের সঙ্গে বেসরকারি খাতের অর্থায়নের ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।
খেলাপি ঋণই ব্যাংক সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায় তার ওপর। মার্চ ২০২৬ শেষে classified/defaulted loans প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের একই সময়ের মূল্যায়নে NPL ratio ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ।
এত বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে আটকে থাকলে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। তাই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসায়িক ব্যর্থতা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। ব্যবসায়িক পুনর্গঠনযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ আত্মসাৎ বা ঋণ পরিশোধ এড়ানোর ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে আবাসন, অবকাঠামো ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। এতে ব্যাংকের সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য ব্যাংকিং খাতকে অস্বাভাবিকভাবে বড় ভূমিকা নিতে হয়।
এই চাপ কমাতে সিকিউরিটাইজেশন, মর্টগেজ বন্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি ফিক্সড-ইনকাম মার্কেটের বিকাশ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে গভীর করা গেলে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার মিলিয়ে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের একটি বহুমুখী কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ভুল হবে সুদের হার কমাকে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা। নীতি সুদ কমানো উদ্যোক্তার অর্থায়ন ব্যয় কমানোর দরজা খুলেছে, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে বিনিয়োগ প্রবাহিত হওয়ার জন্য আরও কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি আরও কমাতে হবে, বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখতে হবে, শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমাতে হবে, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন করতে হবে এবং ঋণ বিতরণে রাজনৈতিক বা সম্পর্কভিত্তিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে এসএমই খাতের অর্থায়ন সহজ করা এবং পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয়। একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন সুদ কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে, অন্যদিকে সরকার যদি ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে একই তহবিলের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুদের হারের নতুন সমীকরণ মূলত একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘ সময়ের কঠোর মুদ্রানীতির ফলে ঋণের খরচ বেড়েছে এবং বিনিয়োগ দুর্বল হয়েছে; অন্যদিকে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও মূলধন সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে শুধু সস্তা ঋণ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বর্তমানে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমেছে, ব্যাংকের ঋণ-আমানত স্প্রেড ৪ শতাংশে সীমিত করার উদ্যোগ এসেছে এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য পাঁচ বছরের কাঠামোও সামনে এসেছে। একই সময়ে ব্যাংকে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য পড়ে আছে, অথচ বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে গেছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়—বাংলাদেশের সমস্যা এখন শুধু অর্থের জোগান নয়; বরং বিনিয়োগের আস্থা, ঋণের গুণমান এবং অর্থের কার্যকর ব্যবহার।
সুতরাং ব্যাংক সংস্কারের সাফল্য শুধু সুদের হার কতটা কমল বা খেলাপি ঋণ কতটা কমল, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। দেখতে হবে, ব্যাংকের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা কতটা সহজে অর্থায়ন পাচ্ছেন, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান কতটা তৈরি হচ্ছে এবং নতুন করে খেলাপি ঋণ সৃষ্টির ঝুঁকি কতটা কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগের দরজা খুলেছে। এখন সেই দরজা দিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যাংক সংস্কার, জ্বালানি সরবরাহ, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, রাজস্বনীতি, পুঁজিবাজার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ—সবগুলোকে একই অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে পরিচালনা করতে হবে। ব্যাংকের পুরোনো ক্ষত না সারিয়ে শুধু ঋণ সস্তা করা হলে তা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু ব্যাংকের সুশাসন, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও বিনিয়োগের আস্থার সংকট সমাধান করা গেলে তবেই এই নতুন সুদ-সমীকরণ টেকসই বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের নতুন চক্র তৈরি করতে পারবে।

