দেশের ব্যাংকিং খাতে একদিকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে ঋণের চাহিদা। এর ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে অব্যবহৃত অর্থের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
এক বছর আগে একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ।
শুধু মে মাসের তুলনায়ও জুনে অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে ৭১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা বা ২১ দশমিক ১৪ শতাংশ। মে শেষে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
মোট তারল্যও বেড়েছে
ব্যাংকিং খাতে শুধু অতিরিক্ত তারল্য নয়, মোট তারল্যের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের জুনে মোট তারল্য ছিল ৫ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে মোট তারল্য বেড়েছে ২৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
এর মধ্যে ব্যাংকগুলোকে নগদ জমা সংরক্ষণ অনুপাত (সিআরআর) এবং বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর) অনুযায়ী ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণ করতে হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষণের বাইরে থাকা অর্থকেই অতিরিক্ত তারল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মোট তারল্যের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছিল বৈদেশিক মুদ্রায়।
টাকা খাটানোর সুযোগ কম
ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা সেভাবে বাড়ছে না। ফলে হাতে থাকা অর্থ বিনিয়োগ বা ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক।
এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)-তে জমা রাখছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। জুন মাসে এই সুবিধায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা জমা পড়ে, যা এ খাতে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
এসডিএফে সুদের হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। এটি কলমানি বাজারের সুদের হারের তুলনায় কম হলেও ব্যাংকগুলো অর্থ অলস রাখার পরিবর্তে এখান থেকে নির্দিষ্ট হারে আয় করতে পারছে।
সব ব্যাংকের পরিস্থিতি এক নয়
তবে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্যের চিত্র সব প্রতিষ্ঠানে একই রকম নয়। কিছু ব্যাংকের হাতে বড় অঙ্কের উদ্বৃত্ত অর্থ থাকলেও কয়েকটি ব্যাংক এখনো দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে স্বল্পমেয়াদি অর্থের ওপর নির্ভর করছে।
এ ধরনের ব্যাংকগুলো কলমানি বাজার, আন্তঃব্যাংক রেপো এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো সুবিধা থেকে অর্থ নিচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, এসব স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ গত বছরের জুনে ছিল ২ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকায়। চলতি বছরের জুনে সেই অঙ্ক আরও বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ একই সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক অংশে অতিরিক্ত অর্থ জমে থাকলেও অন্য অংশকে আবার স্বল্পমেয়াদি অর্থের জন্য ধার করতে হচ্ছে।
বিনিয়োগ কমলে তারল্যই হয়ে উঠতে পারে সমস্যা
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হলে ব্যাংকগুলোর বাড়তে থাকা অতিরিক্ত তারল্য ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তার মতে, ব্যাংকগুলোকে আমানতকারীদের অর্থের ওপর সুদ দিতে হচ্ছে। কিন্তু সেই অর্থ ঋণ বা বিনিয়োগে ব্যবহার করতে না পারলে ব্যাংকের আয় কমে যায় এবং অলস অর্থের ওপরও ব্যয়ের চাপ থাকে।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদও ঋণের দুর্বল চাহিদাকে ব্যাংকগুলোর অব্যবহৃত অর্থ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ না হওয়া অর্থ বাড়ছে। এর ফলে ঋণের সুদের হার মূল্যস্ফীতির হারের নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটকেও ঋণ প্রবৃদ্ধি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশে। বিপরীতে একই সময়ে আমানত বেড়েছে ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
অর্থাৎ ব্যাংকে মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের জমা করা অর্থ যে হারে বাড়ছে, সেই তুলনায় ঋণ নেওয়ার চাহিদা অনেক কম। এই ব্যবধানই ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত তারল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্যাংকগুলোর জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানো যাবে। বিনিয়োগ ও ঋণের চাহিদা দ্রুত না বাড়লে ব্যাংকের হাতে জমে থাকা অতিরিক্ত তারল্য একসময় আর্থিক খাতের জন্য সুবিধার বদলে চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

