দেশের ব্যাংক খাতের বড় খেলাপি ঋণ আদায়ে এবার বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হচ্ছে। ঋণখেলাপিদের বিদেশে পাচার করা অর্থ-সম্পদ এবং বিদেশে অবস্থানরত ঋণগ্রহীতাদের সম্পদের খোঁজ করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তা জব্দ ও দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান রোববার (৯ আগস্ট) জানান, ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। আবার কিছু ঋণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক বা ঋণগ্রহীতাদের অবস্থানও জানা যাচ্ছে না। এসব বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বিদেশে সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বিদেশে থাকা অর্থ ও সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত আইন প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেসব দেশের আইন অনুযায়ী সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব হলে চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
প্রথম পর্যায়ে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থ উদ্ধারে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, কাস্টমসের গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং আয়কর বিভাগের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল কাজ করছে। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের পাওনা খেলাপি ঋণ আদায়েও বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঋণগ্রহীতার বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে আটটি বিদেশি আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা অনেক ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে দেশে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে। কিছু ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে অথবা ঋণগ্রহীতা নিজেই বিদেশে অবস্থান করছেন। দেশে থাকা সম্পদ দিয়ে ঋণ আদায় সম্ভব না হলে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ায় তা জব্দ বা স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও পরিমাণ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
কোনো দেশে সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা জব্দ বা স্থগিত করা সম্ভব হলে পরবর্তী সময়ে সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তি করে অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
এ উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘উদ্ধার না হলে পারিশ্রমিক নয়’ পদ্ধতি। অর্থাৎ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুরুতেই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ করতে হবে না। তারা কোনো সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধার করতে পারলেই চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধারকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দেশে মামলা চললেও বিদেশে অবস্থান করা ঋণখেলাপিদের সম্পদ শনাক্ত করে আইনগতভাবে জব্দ বা স্থগিত করার উদ্যোগ ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিদেশি সম্পদ উদ্ধার করে অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

