চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথ সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দ্বারস্থ হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়েই বরাদ্দ হতে পারে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার।
চলতি মাসের ১৬ তারিখে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বাংলাদেশে নিযুক্ত এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর বরাবর একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়, প্রকল্পটিকে যেন সংস্থাটির ‘ইন্টেগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব’ শীর্ষক প্রকল্পের একটি খসড়া রূপরেখাও পাঠানো হয়েছে সংস্থাটির কাছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছরের মে মাসে এডিবি নিজেই জানিয়েছিল, তারা আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে ওই একই কর্মসূচির আওতায়। সংস্থাটির লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অঞ্চলভেদে উন্নয়নের ভারসাম্য আনা।
দেশের দ্বিতীয় ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হওয়া সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে শাহ আমানতের আন্তর্জাতিক সংযোগ তেমন বাড়েনি। এক সময় এই বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইট চলত সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও নেপালে। কিন্তু এখন যাত্রীদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা হয়ে যাত্রা করতে হয়, যা সময় ও খরচ দুটোই বাড়িয়ে দেয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে এই বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল করেছিল প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার। দুই বছর পর, অর্থাৎ ২০২৫ সালেও এই সংখ্যা ১০ লাখের ঘরেই আটকে আছে — যা প্রবৃদ্ধির অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।
পণ্য পরিবহনের চিত্রও একই রকম দুর্বল। নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট না থাকায় চট্টগ্রামের রপ্তানিকারকদের পণ্য প্রথমে সড়কপথে ঢাকায় পাঠাতে হয়, এরপর সেখান থেকে বিদেশে রপ্তানি হয়। এতে সময়ক্ষেপণ ও বাড়তি ব্যয় দুটোই যুক্ত হয় ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে।
এই বাস্তবতায় গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার জোর দাবি জানান। তাঁর যুক্তি, সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পায়নকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে, কিন্তু আকাশপথের সক্ষমতা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
প্রাথমিক নকশা অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রথম পর্ব দেড় বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এই পর্যায়ে সরকারি অর্থায়নের আনুমানিক পরিমাণ ধরা হয়েছে ২৫ কোটি ডলার। এর বাইরে হোটেল, কনভেনশন সেন্টার ও রেস্তোরাঁর মতো বাণিজ্যিক স্থাপনায় বেসরকারি খাত থেকে আরও তিন থেকে পাঁচ কোটি ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে প্রথম পর্যায়ে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২৮ থেকে ৩০ কোটি ডলারের মধ্যে। তবে সম্ভাব্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে এই অঙ্ক পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
বর্তমানে শাহ আমানতের রানওয়ে ২ হাজার ৯৪০ মিটার দীর্ঘ ও ৪৫ মিটার প্রশস্ত। বড় আকারের যাত্রীবাহী ও কার্গো উড়োজাহাজ ওঠানামার উপযোগী করতে এই রানওয়ে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি নির্মিত হতে পারে সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে ও দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা, বড় উড়োজাহাজের জন্য ছয় থেকে আটটি পার্কিং স্ট্যান্ড এবং প্রায় ছয়টি বোর্ডিং ব্রিজ। টার্মিনাল ভবনও সম্প্রসারণ ও নতুন করে সাজানো হবে, যাতে প্রথম পর্যায়ে বছরে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি যাত্রী সামলানো যায়। দীর্ঘমেয়াদে এই সক্ষমতা দেড় থেকে ২ কোটি যাত্রীতে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে ধাপে ধাপে। প্রথম পর্বে বছরে ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে তিন থেকে পাঁচ লাখ টন পর্যন্ত বাড়ানো হবে। পরিকল্পিত কার্গো হাবে থাকবে বন্ডেড গুদাম, এক্সপ্রেস কার্গো সেবা, ই-কমার্স সুবিধা, হিমাগার এবং ডিজিটাল পণ্য ট্র্যাকিং ব্যবস্থা।
চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্র করতে বিমানবন্দরের ভেতরেই একটি পৃথক ‘রিজিওনাল ট্রান্সফার সেন্টার’ স্থাপনের চিন্তাভাবনা চলছে। এটি চালু হলে বিদেশি যাত্রীরা এই বিমানবন্দরে ট্রানজিট ও ট্রান্সফার সুবিধা পাবেন, যা এখন সম্ভব নয়।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে বিমানবন্দরকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর, লজিস্টিকস কেন্দ্র ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘এয়ার-সি লজিস্টিকস করিডর’ গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে রেল সংযোগ ও উড়াল এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতাও খতিয়ে দেখা হবে।
তবে এভিয়েশন-সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কোনো বিমানবন্দর আঞ্চলিক হাবে পরিণত হয় না। রানওয়ে বড় করা বা টার্মিনাল সম্প্রসারণ একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র — আসল চ্যালেঞ্জ হলো নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করা এবং কার্গো ফ্লাইট পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোকে চট্টগ্রামমুখী করা।
এ জন্য যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রকৃত বাজার চাহিদা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনে এয়ারলাইনসগুলোকে আকৃষ্ট করতে বিশেষ প্রণোদনা বা ছাড়যুক্ত ট্যারিফ কাঠামো বিবেচনায় নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রামের এই বিমানবন্দর প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন নয় — এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের মানচিত্রে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করার একটি কৌশলগত প্রয়াস। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত বাজার কৌশল ও আন্তর্জাতিক পরিবহন সংস্থাগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।

