বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে এগিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে কোনো ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার পর সেই প্রশাসককে সর্বোচ্চ দুই বছর রাখার যে আইনি সীমা এতদিন কার্যকর ছিল, তা আর সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না। ফলে প্রয়োজন হলে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রশাসকের মাধ্যমে কোনো ব্যাংক পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারার ক্ষমতাবলে এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, একই আইনের ৪৭(২) ধারায় পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের আদেশ কার্যকর থাকার মেয়াদ সম্পর্কে যে বিধান রয়েছে, তা ব্যাংক কোম্পানির ক্ষেত্রে সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না।
এর ফলে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে সেখানে প্রশাসক নিয়োগের পর পরিস্থিতি বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে ওই প্রশাসককে দুই বছরের সীমার পরও দায়িত্বে রাখতে পারবে। অর্থাৎ সমস্যাগ্রস্ত কোনো ব্যাংকের পুনর্গঠন, আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কিংবা প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসককে দায়িত্বে রাখার সুযোগ তৈরি হলো।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(১) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম ব্যাংকের স্বার্থ বা আমানতকারীদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কিংবা পরিপন্থী বলে মনে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।
এতদিন ৪৭(২) ধারায় পর্ষদ বাতিলের আদেশ প্রয়োজনে সময় সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও মোট মেয়াদ দুই বছরের বেশি হতে পারত না। একই আইনের ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগ করা ব্যক্তিকে বাতিল হওয়া পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মূলত এই দুই বছরের সীমাবদ্ধতাই কার্যত সরিয়ে দেওয়া হলো। এতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘায়িত করার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল পরিচালনব্যবস্থার কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। বিশেষ করে কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রশাসকদের দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল—পর্ষদ পুনর্গঠন না করে আগের প্রশাসকদের কতদিন দায়িত্বে রাখা যাবে।
নতুন সিদ্ধান্ত সেই জটিলতা অনেকটাই দূর করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন কোনো ব্যাংকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শুধু দুই বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রশাসককে সরিয়ে দিতে হবে না। বরং ব্যাংকের বাস্তব অবস্থা, পুনর্গঠনের অগ্রগতি এবং আমানতকারীদের স্বার্থ বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রশাসকের দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে, যেগুলোর আর্থিক সংকট এতটাই গভীর যে স্বল্প সময়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদের কাছে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
১৪টি ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন
বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে। তবে এসব ব্যাংকের কয়েকটিতে শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্বকারী পরিচালকও রয়েছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে দেশের ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোর পরিচালন কাঠামো পরিবর্তন, অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
একই ধারাবাহিকতায় ব্যাংকের পাশাপাশি অকার্যকর হয়ে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করে এবং সেগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে প্রশাসক নিয়োগ করেছে।
পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণেও পরিবর্তন
সাম্প্রতিক সময়ে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। একীভূতকরণের পর ধাপে ধাপে পুরোনো ব্যাংকগুলোর প্রশাসকদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন ব্যবস্থাপনার হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রশাসক প্রত্যাহার করা হয়েছে। একীভূতকরণের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের কার্যক্রম নতুন কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার পর প্রশাসকদের আর প্রয়োজন না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদেরও ১৫ আগস্টের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।
তবে ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও একীভূতকরণ ও নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো কার্যকর হচ্ছে, আবার কোথাও আর্থিক সংকট ও পুনর্গঠনের কাজ এখনো চলমান। ফলে প্রশাসকদের মেয়াদ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেবে।
ব্যাংক খাতে কী প্রভাব পড়তে পারে
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রশাসকের মেয়াদসংক্রান্ত এই পরিবর্তন মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে আরও দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করছে। কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অনিয়ম বা স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের কারণে তা বাতিল করা হলে, দ্রুত নতুন পর্ষদ গঠন করে দায়িত্ব হস্তান্তরের পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশাসকের মাধ্যমে পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
এর ফলে স্বল্পমেয়াদি চাপের কারণে তড়িঘড়ি করে কোনো ব্যাংকের দায়িত্ব নতুন পর্ষদের কাছে তুলে দেওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল, সেগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এর সঙ্গে জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। দীর্ঘ সময় ধরে একজন প্রশাসকের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালিত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্ত দেশের দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এখন এই ক্ষমতা কীভাবে এবং কতটা সময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়, সেটিই ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

