ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ যখন সময়মতো ফেরত আসে না, তখন প্রথম দেখায় মনে হতে পারে ক্ষতিটা শুধু ব্যাংকের। কিন্তু বাস্তবে খেলাপি ঋণের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ব্যাংকের দেওয়া ঋণের বড় অংশই আসে সাধারণ মানুষের আমানত থেকে। কোনো ঋণ ফেরত না এলে ব্যাংকের হাতে নতুন করে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ কমে যায়, লাভ কমে যায় এবং সেই ঘাটতি সামলাতে ব্যাংককে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হয়। বাংলাদেশে সমস্যাটি এখন আর ছোট কোনো বিষয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে পড়েছিল। বিশ্বব্যাংকও বলছে, দেশের ব্যাংক খাত দুর্বল করপোরেট সুশাসন, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়া এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার মতো সমস্যার মুখোমুখি।
খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রথম বড় চাপ পড়ে ব্যাংকের ওপর। ব্যাংক কোনো গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার সময় ধরে নেয় যে নির্দিষ্ট সময় পর সেই টাকা সুদসহ ফেরত আসবে। সেই অর্থ আবার অন্য ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিকে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। কিন্তু ঋণ খেলাপি হলে সেই অর্থের প্রবাহ আটকে যায়। ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে টাকা আলাদা করে রাখতে হয়, যাকে বলা হয় প্রভিশন। খেলাপি ঋণ যত বাড়ে, প্রভিশনের প্রয়োজনও তত বাড়ে এবং ব্যাংকের মূলধনের ওপর চাপ পড়ে। এতে ব্যাংকের মুনাফা কমতে পারে, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং দুর্বল ব্যাংকের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের আস্থাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা জোরদার করা এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের ব্যবস্থা তৈরিকে এখন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক অর্থায়ন কর্মসূচিতেও আমানত সুরক্ষা ও দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
এরপর ক্ষতির প্রভাব পড়ে ভালো ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসার ওপর। একটি ব্যাংকের বড় অংশের অর্থ যদি ফেরত না আসে, তখন নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই আরও সতর্ক হয়ে যায়। এতে যেসব উদ্যোক্তা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করেন, তারাও ঋণ পেতে বেশি যাচাই-বাছাই, বেশি জামানত বা বেশি খরচের মুখে পড়তে পারেন। ব্যাংকের ঝুঁকি বেড়ে গেলে ঋণের দামও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের প্রবাহ কমে যায়। একটি কারখানা সম্প্রসারণ করতে না পারলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় না, ব্যবসা নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে পারে না, আমদানি বা উৎপাদন বাড়াতে পারে না। ফলে খেলাপি ঋণের সমস্যা ধীরে ধীরে শুধু ব্যাংকের হিসাবের খাতা নয়, বাস্তব অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা থাকলে ব্যাংকের টাকা আরও দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। ব্যাংকারদের একটি অংশের মতে, শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা ও দ্রুত ঋণ আদায় না হলে এই সমস্যা আরও জটিল হতে পারে।
সবশেষে এর চাপ সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রের ওপরও আসতে পারে। কোনো ব্যাংক গুরুতর সমস্যায় পড়লে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে বা ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করে কোনো ব্যাংককে সহায়তা করতে হলে সেই অর্থের উৎস শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ—অর্থাৎ করদাতা ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা। আবার দুর্বল ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে গিয়ে যদি ভালো ব্যাংকগুলোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তাহলে পুরো ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই খেলাপি ঋণকে শুধু ‘ব্যাংকের টাকা ফেরত না পাওয়ার সমস্যা’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে আমানতকারীর নিরাপত্তা, উদ্যোক্তার ঋণ পাওয়া, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—সবকিছুর সম্পর্ক রয়েছে। মূল কথা হলো, একজন ঋণগ্রহীতা ঋণ ফেরত না দিলে ক্ষতিটা কেবল ব্যাংকের হিসাবের খাতায় আটকে থাকে না; ব্যাংক থেকে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তর ঘুরে শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষতির বোঝা ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো সমাজে। তাই খেলাপি ঋণ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ শুধু নতুন ঋণ দেওয়া বা পুরোনো ঋণ পুনঃতফসিল করা নয়; ঋণ দেওয়ার সময় যাচাই শক্ত করা, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত ঋণ আদায়ের সক্ষমতা তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

