দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালুর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রাথমিকভাবে ১ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার তরুণকে কম সুদে ও জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রস্তাবিত তহবিলটির নাম রাখা হতে পারে ‘উদ্যোগ’।
তরুণদের নতুন ব্যবসা শুরু করা কিংবা এরই মধ্যে থাকা ছোট ব্যবসা সম্প্রসারণে অর্থায়ন করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণদের এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তহবিলের কাঠামো, ঋণ দেওয়ার পদ্ধতি, উপকারভোগী নির্বাচন এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ভূমিকা নিয়ে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের নেতাদের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও মাশরুর আরেফিন সাংবাদিকদের জানান, প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে মূলত ২৫ থেকে ২৭ বছর বয়সী তরুণদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের প্রায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে পারে। একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে এই উদ্যোগের বিশেষ দিক হতে পারে ঋণের পাশাপাশি অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা। ব্যাংকগুলো তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল থেকে ঋণের সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে। পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে একজন তরুণ উদ্যোক্তা ১০ লাখ টাকা ঋণের পাশাপাশি আরও ১০ লাখ টাকা অনুদান পেতে পারেন। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তার জন্য মোট আর্থিক সহায়তা দাঁড়াতে পারে ২০ লাখ টাকা।
এ ধরনের সহায়তা বাস্তবায়িত হলে শুধু নতুন ব্যবসা শুরুর সুযোগই তৈরি হবে না, বরং যেসব তরুণের ব্যবসার ধারণা আছে কিন্তু প্রাথমিক মূলধনের অভাবে এগোতে পারছেন না, তাদের জন্যও নতুন দরজা খুলতে পারে। বিশেষ করে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে ছোট উদ্যোগ গড়ে উঠলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় মূলত উপজেলা পর্যায়ের তরুণ উদ্যোক্তাদের বেছে নেওয়া হবে। ব্যাংকগুলো নির্ধারিত উপজেলাগুলো থেকে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা নির্বাচন করবে। যেসব উদ্যোক্তা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন এবং ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করবেন, ভবিষ্যতে তাদের অতিরিক্ত অনুদান দেওয়ার সুযোগও রাখা হতে পারে।
তবে এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন। কারণ ঋণ ও অনুদানের মতো সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব কাজ করলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা বাদ পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই যোগ্যতা, ব্যবসার সম্ভাবনা, দক্ষতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় উদ্যোক্তা বাছাই করা জরুরি।
মাশরুর আরেফিন মনে করেন, ৫ হাজার তরুণকে অর্থায়ন করার পর তাদের মধ্যে যদি মাত্র প্রায় ১০০ জনও সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন, তাহলেও দেশের উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে নতুন একটি ধারার সূচনা হতে পারে। অর্থাৎ এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু কতজনকে ঋণ দেওয়া হলো, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং অর্থায়ন পাওয়া উদ্যোক্তাদের মধ্যে কতজন টেকসই ব্যবসা গড়ে তুলতে পারলেন, সেটিই হবে বড় বিষয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুরুতে তহবিলের আকার ৫০০ কোটি টাকা হতে পারে। পরে সেটি বাড়িয়ে ১ হাজার কোটি টাকায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদন, কৃষি, মৎস্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং এমনকি বাড়িভিত্তিক খাদ্য ব্যবসার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ এই অর্থায়নের আওতায় আসতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণদের বড় একটি অংশ কর্মসংস্থানের জন্য চাকরির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চাকরির সুযোগের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা গেলে তরুণদের একটি অংশ নিজেরাই ব্যবসা তৈরি করতে পারেন এবং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। এই জায়গা থেকেই প্রস্তাবিত তহবিলটি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শুধু সহজ শর্তে ঋণ বা অনুদান দিলেই উদ্যোক্তা সফল হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা, বাজার সম্পর্কে ধারণা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, পণ্য বিপণন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অর্থায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে এই উদ্যোগের ফল আরও কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ‘উদ্যোগ’ নামটি চূড়ান্ত হয়নি। একইভাবে তহবিলের মোট আকার, ঋণের পরিমাণ, সুদের হার এবং যোগ্যতার শর্তও এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। চূড়ান্ত নীতিমালা তৈরির আগে ব্যাংকারদের মতামত জানতেই মঙ্গলবারের বৈঠকটি করা হয়েছে।
ফলে এখনই ১ হাজার কোটি টাকার তহবিল বা ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী অনুমোদনের পরই এর কাঠামো স্পষ্ট হবে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নের উৎস হতে পারে। বিশেষ করে জামানত দেওয়ার সক্ষমতা নেই এমন তরুণদের জন্য কম সুদের ঋণের সঙ্গে অনুদানের সুযোগ যুক্ত হলে ব্যবসা শুরুর বাধা কিছুটা কমবে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সঠিক উদ্যোক্তা নির্বাচন, অর্থের যথাযথ ব্যবহার, ব্যাংকের তদারকি এবং সফল ব্যবসাগুলোকে পরবর্তী পর্যায়ে সহায়তা দেওয়ার ওপর।

