সংসারের খরচ ও শিক্ষাব্যয় বাড়লেও ব্যাংকে সঞ্চয়ের দিকে আগ্রহ হারাচ্ছে না দেশের শিক্ষার্থীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের আমানত ফেব্রুয়ারি থেকে টানা বাড়ছে। মে শেষে এসব হিসাবে মোট জমা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি টাকার বেশি। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ায় দেশের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মে শেষে স্কুল ব্যাংকিং হিসাবগুলোতে মোট আমানত ছিল ২০ দশমিক ২৮ বিলিয়ন টাকা। এর আগের মাস এপ্রিল শেষে এই পরিমাণ ছিল ২০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন টাকা। মার্চে ছিল ২০ দশমিক ০৩ বিলিয়ন এবং ফেব্রুয়ারিতে ১৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ চার মাসের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের এসব হিসাবে জমা বেড়েছে প্রায় ৬৩ কোটি টাকা। শুধু মে মাসেই আগের মাসের তুলনায় আমানত বেড়েছে প্রায় ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা।
এই সময়ে পরিবারের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপও কম ছিল না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী, মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা জুনে কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ খাবার, শিক্ষা, পরিবহনসহ দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ এখনো যথেষ্ট বেশি। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক আমানত ধারাবাহিকভাবে বাড়ার বিষয়টি শুধু টাকার পরিমাণ দিয়ে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না; এটি পরিবার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংকিং এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি হওয়ারও একটি ইঙ্গিত।
স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতাও বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করছে। মে শেষে দেশে এ ধরনের হিসাবের সংখ্যা ৫৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি হয়েছে। এপ্রিল শেষে যা ছিল প্রায় ৫১ লাখ ৮৬ হাজার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসে হিসাব বেড়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬০৬টি। মে শেষে ছেলেদের নামে হিসাব ছিল প্রায় ২৭ লাখ ১০ হাজার এবং মেয়েদের নামে ২৬ লাখ ১০ হাজার। ফলে শুধু হিসাবের সংখ্যা নয়, ছেলে ও মেয়ে দুই ধরনের শিক্ষার্থীর মধ্যেই ব্যাংকিং ব্যবহারের বিস্তার ঘটছে।
শিক্ষার্থীদের মোট আমানতের বড় অংশ অবশ্য এখনো শহরকেন্দ্রিক। মে শেষে শহরাঞ্চলের স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে জমা ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। গ্রামাঞ্চলে জমা ছিল প্রায় ৫৮৭ কোটি টাকা। এই ব্যবধান দেখায়, স্কুল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার ঘটলেও গ্রাম ও শহরের মধ্যে আর্থিক সেবার ব্যবহারে এখনো পার্থক্য রয়েছে। তবে ব্যাংকের শাখাগুলোকে কাছের অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্কুল ব্যাংকিং সেবা যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়ায় গ্রামাঞ্চলেও এই ব্যবধান কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালে শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা এবং ছোটবেলা থেকেই সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। শিক্ষার্থীরা ২০১১ সাল থেকে এসব হিসাবে টাকা জমাতে শুরু করে। প্রথম বছরে মাত্র ২৯ হাজার ৮০টি হিসাব খোলা হয়েছিল। এখন সেই সংখ্যা ৫৩ লাখ ছাড়িয়েছে। বর্তমানে ৫৯টি ব্যাংক স্কুল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। অর্থাৎ দেড় দশকের মধ্যে এই কর্মসূচি একটি সীমিত পরিসরের সঞ্চয় উদ্যোগ থেকে বড় ধরনের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।
এ বছর এই ব্যবস্থায় আরও একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে ১১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে পারত। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৯ ফেব্রুয়ারি নির্দেশনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৫ বছর করেছে। এর ফলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও এই সুবিধার আওতায় এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বয়সসীমা বাড়ানোর ফলে বছরের প্রথম প্রান্তিকেই প্রায় ১৩ লাখ ৪০ হাজার নতুন শিক্ষার্থী এই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে হিসাব ও আমানত বাড়ার পেছনে নতুন বয়সসীমার প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সুবিধাও শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক সহজ রাখা হয়েছে। মাত্র ১০০ টাকা জমা দিয়েও হিসাব খোলা যায়। অনেক ক্ষেত্রে হিসাব পরিচালনার ফি ও অন্যান্য চার্জ কম বা ছাড় দেওয়া হয়। ন্যূনতম ব্যালান্স রাখার বাধ্যবাধকতাও নেই এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও তুলনামূলক কম খরচের ডেবিট কার্ডের সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে অল্প অল্প করে জমানো টাকা ব্যাংকে রাখার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবছর বৃত্তি ও বিভিন্ন আর্থিক সহায়তার টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়াও এসব হিসাব বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে ব্যাংকাররা মনে করছেন।
তবে এই প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়তো আমানতের পরিমাণ নয়, বরং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। একজন শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকে নিজের নামে ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করলে টাকা জমা রাখা, লেনদেন করা এবং প্রয়োজন ও সঞ্চয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝার সুযোগ পায়। ভবিষ্যতে কর্মজীবনে প্রবেশের পর এই অভ্যাস সঞ্চয়, ঋণ, ডিজিটাল লেনদেন ও অন্যান্য আর্থিক সেবার ব্যবহারে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ স্কুল ব্যাংকিং শুধু শিক্ষার্থীদের টাকা জমা রাখার ব্যবস্থা নয়; এটি ভবিষ্যতের ব্যাংক গ্রাহক তৈরির একটি প্রক্রিয়াও।
তারপরও শহর ও গ্রামের হিসাবের পার্থক্য, শিক্ষার্থীদের আর্থিক জ্ঞান এবং ব্যাংকিং সেবার বাস্তব ব্যবহার কতটা বাড়ছে এসব বিষয় নজরে রাখা জরুরি। শুধু হিসাব খোলা হলেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্পূর্ণ হয় না; হিসাব সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা এবং সঞ্চয়ের পাশাপাশি নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা তৈরি করাও প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগগুলো যদি এই দিকগুলোকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে স্কুল ব্যাংকিংয়ের বাড়তে থাকা পরিধি ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

