শরিয়াহভিত্তিক বন্ড সুকুকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আরও সহজ করতে বরাদ্দ কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে মোট সুকুকের ১০ শতাংশ নির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকবে শুধু ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য, যা আগে ছিল না। এর ফলে ব্যাংক-বিমার মতো বড় প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না গিয়েই সুকুকে বিনিয়োগের পথ খুলে গেল সাধারণ মানুষের সামনে।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে এ–সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, সুকুকের অর্ধেক অংশ অর্থাৎ ৫০ শতাংশ পাবে পুরোপুরি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানি। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামি শাখা ও উইন্ডোগুলোর জন্য থাকবে ৩০ শতাংশ। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে ১০ শতাংশ। আর অবশিষ্ট ১০ শতাংশ ভাগ হবে প্রচলিত ব্যাংক-বিমা প্রতিষ্ঠান, প্রভিডেন্ট ফান্ড, আমানত বিমা প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ কোম্পানি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে।
পুরনো কাঠামোয় ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনও নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ ছিল না। তারা প্রভিডেন্ট ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একত্রে মোট ১৫ শতাংশ কোটার মধ্যেই আবেদন করতেন, ফলে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাদের সুযোগ ছিল অনেকটাই সীমিত। এছাড়া শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও ইসলামি শাখা মিলিয়ে আগে বরাদ্দ ছিল ৮০ শতাংশ, আর প্রচলিত ব্যাংক-বিমার জন্য ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। নতুন কাঠামোয় এই অনুপাত পুনর্বিন্যাস করে ব্যক্তি শ্রেণিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা নীতিগত দিক থেকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
সুকুক হলো ইসলামি শরিয়াহ নীতিমালা মেনে তৈরি একটি বিনিয়োগ মাধ্যম। প্রচলিত বন্ডে যেখানে সুদভিত্তিক আয়ের নিশ্চয়তা থাকে, সুকুকে তার বদলে মুনাফা-ভাগাভাগির নীতিতে আয় নির্ধারিত হয়। সরকার সাধারণত বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এই মাধ্যম ব্যবহার করে থাকে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে মুনাফাসহ অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকায় ব্যাংক আমানতের বিকল্প হিসেবে দিন দিন এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, বিশেষত যারা সুদ এড়িয়ে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ খুঁজছেন তাদের কাছে।
নতুন নিয়মে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, সুকুক ইস্যুর সময় আবেদন করলে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট অংশ আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকবে। তবে এই ১০ শতাংশ কোটা থাকার অর্থ এই নয় যে আবেদনকারী মাত্রই সুকুক পাবেন। প্রকৃত বরাদ্দ নির্ভর করবে মোট আবেদনের পরিমাণ, নির্দিষ্ট ইস্যুর আকার এবং সংশ্লিষ্ট শর্তাবলির ওপর।
দেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সুকুকের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সার্বিকভাবে দেখলে, ব্যাংকে টাকা জমা রাখার গতানুগতিক পথের বাইরে শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের একটি নতুন ও অপেক্ষাকৃত সহজ দরজা খুলে দিলো বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত।

