দেশের খুচরা বাজারে ডিজিটাল লেনদেনের চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাধ্যতামূলক করার পর থেকে বাংলা কিউআর কোডের ব্যবহার এখন প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারা দেশে ৩৭ লাখের বেশি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এই কিউআর কোড স্থাপন করেছে, আর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩২ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এই মাধ্যমে।
গত জুলাই মাসে কেনাকাটার বিল পরিশোধে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব পুরোনো কোড সরিয়ে বিক্রেতাদের কাছে নতুন এই কোড বসাতে বাধ্য হয়েছে। একটি লক্ষ্যযোগ্য বিষয় হলো, একজন বিক্রেতার একটি হিসাবের বিপরীতেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চার থেকে পাঁচটি পর্যন্ত কোড দেওয়া হচ্ছে, যা মূলত গ্রাহকদের নগদ টাকা তোলার একটি সহজ বিকল্প তৈরি করে দিয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গার ছোট দোকান থেকে বড় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে, আর এর প্রভাবে মোবাইল আর্থিক সেবার চিরচেনা এজেন্ট-নির্ভর ব্যবস্থাটি এখন বড় ধরনের চাপে পড়েছে।
সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানটি হলো একটি শীর্ষ মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা, যার আওতায় ৮ লাখ ৫ হাজার ৩৫৭টি কোড স্থাপিত হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা একটি বেসরকারি ব্যাংক বসিয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার ৬৬৩টি কোড। তৃতীয় স্থানে থাকা একটি ইসলামি ধারার ব্যাংকের কোড সংখ্যা ৩ লাখ ১১ হাজার ৯৩৭টি। রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি ব্যাংকও এই তালিকায় ভালো অবস্থানে রয়েছে—একটির কোড সংখ্যা ২ লাখ ৭২ হাজার ৫০৭টি, আরেকটির ২ লাখ ৬৮ হাজার ৩টি। এছাড়া একটি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান বসিয়েছে ২ লাখ ৬ হাজার ১৮৯টি কোড। আরও কিছু ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান লক্ষাধিক কোড স্থাপন করে তালিকার পরের সারিতে রয়েছে, যাদের সংখ্যা এক লাখ থেকে পৌনে দুই লাখের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
আগামী অক্টোবর মাস থেকে এই ব্যবস্থায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা গ্রহণে বিক্রেতাদের কোনো খরচ গুনতে হবে না। অর্থাৎ গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং তা নগদে ফিরিয়ে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াতেই বিক্রেতাদের জন্য থাকছে না কোনো মাশুল। এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে মোবাইল আর্থিক সেবার এজেন্টদের ক্ষেত্রে, যেখানে ক্যাশ আউট করতে গ্রাহককে নির্দিষ্ট হারে ফি দিতে হয়, এবং সেই ফি থেকে সরকার প্রতি হাজারে তিন টাকার বেশি রাজস্ব পায়।
এই পার্থক্যটিই এখন খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কিউআর কোডের মাধ্যমে বিক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা তোলা যেহেতু সম্পূর্ণ খরচমুক্ত এবং এতে সরকারকে কোনো রাজস্বও দিতে হয় না, তাই গ্রাহক ও বিক্রেতা—দুই পক্ষের জন্যই এই পথ অনেক বেশি সাশ্রয়ী হয়ে উঠছে। কিন্তু ঠিক এই কারণেই সরকারের রাজস্ব আদায় এবং মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কাঠামোর জন্য এটি একধরনের নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বিভাগ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় ছাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, বছরে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনে কোনো টার্নওভার কর দিতে হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই সুযোগের সঙ্গে কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনের করমুক্ত সুবিধা মিলে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের জন্য কর সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই কমে আসবে। তবে একই সঙ্গে এই প্রবণতা এমএফএস খাতের এজেন্ট ব্যবসাকে দুর্বল করে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ডিজিটাল আর্থিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের প্রশ্নেও নতুন আলোচনার জন্ম দিতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলা কিউআর কোডের এই দ্রুত সম্প্রসারণ শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বরং দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার কাঠামোতেও একটি বড় রূপান্তরের সূচনা করছে। আগামী কয়েক মাসে সরকারের নতুন সুবিধা কার্যকর হলে এই প্রবণতা আরও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর সে সঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের ব্যবসায়িক কৌশল নতুনভাবে সাজাতে হতে পারে।

