চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারিতে প্রায় ১৯.৬৭ লাখ কোটি টাকা থাকা মোট আমানত জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ২০.৭৯ লাখ কোটি টাকায়। তবে বছরের শুরুতে আমানত বাড়ার যে গতি দেখা গিয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা কমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে এক বছর আগের তুলনায় ব্যাংক আমানত বেড়েছিল ১০.৪৫ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১১.২৮ শতাংশ এবং মার্চে ১১.৭৬ শতাংশে ওঠে। এপ্রিল মাসে প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ১১.৯৯ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর মে মাসে তা নেমে আসে ১১.৪১ শতাংশে এবং জুনে আরও কমে দাঁড়ায় ১০.৭৪ শতাংশে।
অর্থাৎ বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমানত সংগ্রহে গতি বাড়লেও দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেই গতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল প্রায় ১৯.৬৭ লাখ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ১০.৪৫ শতাংশ বেশি। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ১১.১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় জানুয়ারির হার কিছুটা কম ছিল, তবু তা দুই অঙ্কেই ছিল।
প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক বেশি আমানত সুদ বছরের শুরুতে ব্যাংকে টাকা রাখার প্রবণতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। উচ্চ সুদের কারণে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নগদ অর্থ হাতে রাখার বদলে ব্যাংকে জমা রাখায় আমানতের পরিমাণও বেড়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে আমানত বেড়ে প্রায় ১৯.৯৫ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তখন বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.২৮ শতাংশ। মার্চে মোট আমানত আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০.৩২ লাখ কোটি টাকায়। এক মাসে আমানত বেড়েছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
এ সময় আমানতের সুদহার বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় বাড়া এবং ব্যাংক খাত নিয়ে মানুষের আস্থায় ধীরে ধীরে উন্নতি—সব মিলিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের আমানতের ভিত্তি শক্তিশালী করার সুযোগ পায়।
এপ্রিলেও সেই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ওই মাসে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১১.৯৯ শতাংশে উঠে প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। মোট আমানত ছিল প্রায় ২০.৩৮ লাখ কোটি টাকা।
তবে মে মাস থেকে চিত্র কিছুটা বদলাতে শুরু করে। ওই মাসে আমানত বেড়ে প্রায় ২০.৪১ লাখ কোটি টাকা হলেও বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ১১.৪১ শতাংশে।
জুনে আমানতের পরিমাণ আরও বাড়ে। মে মাসের তুলনায় প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা বেড়ে জুন শেষে মোট আমানত দাঁড়ায় ২০.৭৯ লাখ কোটি টাকায়। কিন্তু একই সময়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ১০.৭৪ শতাংশে। ২০২৫ সালের জুনে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল প্রায় ১৮.৭৭ লাখ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরি বলেন, আমানত ধারাবাহিকভাবে বাড়া ব্যাংক খাতে তারল্য ও মানুষের আস্থার জন্য ইতিবাচক। তবে এর সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
তার মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকে জমা হওয়া অর্থকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগানো। ঋণের চাহিদা কম থাকলে ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত অর্থ পড়ে থাকবে এবং আমানত বাড়লেও অর্থনীতিতে এর কাঙ্ক্ষিত প্রভাব দেখা যাবে না।
ছয় মাসের হিসাবেও বিষয়টি স্পষ্ট। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে আমানত প্রবৃদ্ধি ১০.৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১.৯৯ শতাংশে উঠেছিল। কিন্তু পরের দুই মাসে তা আবার কমে মে মাসে ১১.৪১ শতাংশ এবং জুনে ১০.৭৪ শতাংশে নেমে যায়।
ব্যাংকাররা বলছেন, প্রবৃদ্ধির হার কমেছে মানে আমানত কমে গেছে—এমনটি নয়। মোট আমানতের পরিমাণ বরং বেড়েছে। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বৃদ্ধির গতি কমেছে।
প্রবাসী আয়ও ব্যাংকের আমানত বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থের বড় একটি অংশ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করে। পরে সেই অর্থ সুবিধাভোগীদের হাতে যায় অথবা ব্যাংক হিসাবে জমা থাকে।
অন্যদিকে, তুলনামূলক বেশি আমানত সুদও মানুষকে ব্যাংকে অর্থ রাখায় উৎসাহিত করছে। ফলে নগদ অর্থ ধরে রাখার পরিবর্তে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি অংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ জমা রাখছে।
তবে ব্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের দুর্বল চাহিদা। মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাংকে বেশি টাকা জমা রাখলেও বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের চাহিদা সেভাবে বাড়ছে না।
এর ফলে ব্যাংকের হাতে থাকা অর্থের একটি বড় অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
ব্যাংকের জন্য পরিস্থিতিটি একদিকে ইতিবাচক, অন্যদিকে চ্যালেঞ্জেরও। আমানত বাড়লে ব্যাংকের অর্থের জোগান ও তারল্য পরিস্থিতি শক্তিশালী হয়। কিন্তু সেই অর্থ ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে কাজে লাগানো না গেলে ব্যাংকের তহবিল কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

