বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরও ব্যাংক খাতে ঋণ ও আমানতের গড় সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড কমেনি। বরং জুন শেষে ব্যাংক খাতের গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭০ শতাংশে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার চেয়ে স্প্রেড এখনো ১ দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। কোনো কোনো বিদেশি ব্যাংকে এই ব্যবধান আবার ৮ শতাংশেরও বেশি।
এর ফলে ঋণের সুদ কমিয়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের খরচ কমানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ঋণগ্রহীতাদের জন্য অর্থের খরচও থাকছে তুলনামূলকভাবে বেশি।
জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে আমানতের গড় সুদ ছিল ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ, বিপরীতে ঋণের গড় সুদ ১১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ফলে এ খাতে স্প্রেড দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আমানতের গড় সুদ ছিল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং ঋণের সুদ ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। জুন শেষে এসব ব্যাংকের স্প্রেড ছিল ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। তারা আমানতে গড়ে ২ দশমিক ১০ শতাংশ সুদ দিলেও ঋণ দিয়েছে ১০ দশমিক ৩৭ শতাংশ সুদে।
তবে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এসব ব্যাংকে স্প্রেড ছিল ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার নিচে। এখানে আমানতের গড় সুদ ৭ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ঋণের সুদ ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ।
মে মাসেও ব্যাংক খাতে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। ওই মাসে আমানতের গড় সুদ ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ, আর ঋণের গড় সুদ ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ফলে স্প্রেড দাঁড়িয়েছিল ৫ দশমিক ৭০ শতাংশে। অর্থাৎ জুনে এসে সার্বিক ব্যবধানে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
৪ শতাংশের সীমা বেঁধে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
স্প্রেড কমাতে গত ৩০ জুন নতুন নির্দেশনা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ক্রেডিট কার্ড ও ভোক্তাঋণ ছাড়া অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রে আমানত ও ঋণের গড়ভারিত সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, অতিরিক্ত স্প্রেডের কারণে ব্যবসা ও বাণিজ্যে অর্থায়নের খরচ বাড়ছে। এতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই ঋণের ব্যয় কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত স্প্রেড কমানো সহজ নয়। আমানত সংগ্রহ করতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ায় প্রভিশন সংরক্ষণে বড় অঙ্কের অর্থ আটকে থাকছে। পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে এসব খরচ সামলে ঋণের সুদ কমানো ব্যাংকগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই মানতে হবে। তবে ঋণ ও আমানতের সুদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারের প্রতিযোগিতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংকগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এসএমই ঋণেও বাড়ছে উদ্বেগ
নতুন নির্দেশনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা বা এসএমই খাতে বেশি ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলো। কারণ বড় ঋণের তুলনায় ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বেশি হয়। ফলে মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেডের মধ্যে থেকে সেই খরচ সামলানো কঠিন বলে মনে করছে ব্যাংকগুলো।
এসএমই খাতে অন্যতম বড় ঋণদাতা ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান জানান, এই খাতে ঋণের পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় ব্যাংকের আয় ও ব্যয়ের অনুপাত প্রায় ৬৫ শতাংশ। তাই মাত্র ৪ শতাংশ স্প্রেডে সব খরচ মেটানো কঠিন। এ কারণে এসএমই ঋণকে স্প্রেডের সীমার বাইরে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে উচ্চ ঋণসুদের চাপ সরাসরি পড়ছে ব্যবসায়ীদের ওপর। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কাঁচামাল, গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি চাপের মুখে রয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়াতেই স্প্রেড ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান ঋণ ও আমানতের ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলেও নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নির্দেশনাটি কার্যকর করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্প্রেড ৪ শতাংশে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও এটি সাময়িক পদক্ষেপ। শুধু নির্দেশনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলোর সুদের ব্যবধান কমানো সম্ভব নয়।
তাঁর মতে, খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি ও ব্যাংকগুলোর অদক্ষতা কমিয়ে কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর উচিত সুদের ব্যবধান বাড়িয়ে আয় করার বদলে নিজেদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া।
সংক্ষেপে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার তুলনায় ব্যাংক খাতের সুদহারের ব্যবধান এখনো বেশ বড়। ফলে ঋণের খরচ কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে শুধু নির্দেশনা নয়, ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করাও জরুরি।

