বিশেষ বিশ্লেষণ
ব্যাংকিং পেশা মানেই অনেকের ধারনা ভালো বেতন, সামাজিক মর্যাদা আর স্থিতিশীল ক্যারিয়ারের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই ছবির আড়ালে আরেকটি বাস্তবতা আছে-অফিসের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও অনেক ব্যাংকারের কাজ শেষ হয় না। মাসের শেষ, ঋণ আদায়ের লক্ষ্য, অডিট, রিপোর্ট, গ্রাহকের চাপ কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জরুরি নির্দেশ-সব মিলিয়ে দিনের কর্মঘণ্টা কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যায়, তা অনেকের কাছেই নতুন কিছু নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যাংকের ব্যবসা যত বেশি প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে, সেই মুনাফার দৌড়ে কর্মীদের সময় ও স্বাস্থ্যের মূল্যও কি বাড়ছে?
এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে ঘানার একটি ব্যাংকিং কেস স্টাডিকে ঘিরে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঘানার বিজনেস এন্ড ফিন্যান্সিয়াল টাইম্স -এ প্রকাশিত একটি কেস স্টাডিতে ‘থিওচারিস’ নামে একজন ব্যাংক সিইওর বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সেখানে তিনি তাঁর সাবেক সহকর্মী ‘নানা’র মৃত্যু প্রসঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। লেখাটিতে বলা হয়, কিছু ব্যাংকারের ক্ষেত্রে ১০, ১২ এমনকি তারও বেশি ঘণ্টা কাজের চাপ তৈরি হয় এবং ভোরের মিটিং বা সন্ধ্যার কলও কর্মজীবনের অংশ হয়ে ওঠে। তবে এটি একটি কেস স্টাডি; তাই এতে থাকা নির্দিষ্ট ব্যক্তি, ঘটনা বা অভিযোগকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের প্রমাণিত বাস্তবতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অফিস ছুটির পরও কেন শেষ হয় না ব্যাংকারের কাজ?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও কাজের চাপ নিয়ে গবেষণার নজির রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ২৫৬ কর্মকর্তার ওপর জরিপ চালানো হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, কাজ-সম্পর্কিত চাপ, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের চাপ-তিন ধরনের চাপই ব্যাংক কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতার সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং পরিবেশে অনেক কর্মকর্তাকে নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরেও কাজ করতে হয় এবং ব্যস্ত শাখার কিছু কর্মকর্তা সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করেন।
এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি। ব্যাংকের কাজ শুধু কাউন্টারে গ্রাহক সেবা দেওয়া নয়। দিনের লেনদেন শেষ হওয়ার পর হিসাব মেলানো, ঋণের কাগজপত্র, কমপ্লায়েন্স, রিপোর্ট তৈরি, অডিটের প্রস্তুতি, ঋণ আদায়ের হিসাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা বাস্তবায়ন-অনেক কাজই অফিস সময়ের পর গড়াতে পারে। আবার ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপও রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে কর্মঘণ্টা একটি বিষয়, আর বাস্তবে একজন কর্মী কখন অফিসে ঢোকেন এবং কখন দিনের কাজ শেষ করে বের হন-দুটি সবসময় এক নয়।
বাংলাদেশের শ্রম আইনে সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের স্বাভাবিক কর্মঘণ্টা সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত নির্ধারিত। নির্দিষ্ট শর্তে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে ব্যাংকের সব ধরনের কর্মকর্তা ও কর্মীর ক্ষেত্রে শ্রম আইনের একই বিধান সরাসরি প্রযোজ্য কি না, তা পদ, দায়িত্ব ও কর্মসংস্থানের ধরন অনুযায়ী আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়। তাই ‘ব্যাংকার দিনে সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা কাজ করতে পারবেন’-এমন সরল সিদ্ধান্ত শুধু শ্রম আইনের একটি ধারা দেখেই দেওয়া ঠিক হবে না।
বেশি সময় মানেই কি বেশি উৎপাদন?
ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘ সময় কাজ করার পক্ষে সবচেয়ে প্রচলিত যুক্তি হলো-চাপ বেশি, তাই সময়ও বেশি দিতে হবে। কিন্তু অর্থনীতির সাধারণ হিসাব বলছে, কর্মঘণ্টা বাড়লেই উৎপাদনশীলতা একই হারে বাড়ে না। বরং দীর্ঘ সময়ের কাজের সঙ্গে ক্লান্তি যুক্ত হলে ভুলের ঝুঁকি বাড়তে পারে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান কমতে পারে এবং কর্মীর কাজের আগ্রহও কমে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির গবেষণাটিও দেখেছে, ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাজ-সম্পর্কিত ও সাংগঠনিক চাপ বাড়লে কর্মদক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অর্থাৎ একটি ব্যাংকের জন্য হিসাবটা শুধু ‘একজন কর্মী আরও তিন ঘণ্টা অফিসে থাকলেন’-এত সহজ নয়। ওই তিন ঘণ্টায় তিনি কতটা কার্যকর কাজ করতে পারলেন, ভুলের সম্ভাবনা কতটা বাড়ল, পরদিন তাঁর কর্মক্ষমতা কেমন থাকল এবং দীর্ঘমেয়াদে তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে টিকে থাকলেন কি না-এসবও ব্যবসার খরচের অংশ। একজন কর্মীকে দীর্ঘ সময় অফিসে আটকে রেখে যদি উৎপাদনশীলতা কমে যায়, তাহলে কাগজে বাড়তি কর্মঘণ্টা থাকলেও ব্যাংকের প্রকৃত লাভ নাও বাড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ গবেষণায়ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে শক্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৩৫-৪০ ঘণ্টা কাজ করা ব্যক্তিদের তুলনায় স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ এবং ইস্কেমিক হৃদ্রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি হওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত স্ট্রোক ও হৃদ্রোগে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মৃত্যুর হিসাবও দিয়েছে সংস্থা দুটি।
কর্মীর চাপ শেষ পর্যন্ত ব্যাংকেরও চাপ
এখানেই বিষয়টি মানবিকতার সীমা পেরিয়ে ব্যবসায়িক আলোচনায় চলে আসে। একজন ব্যাংকার অসুস্থ হলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; প্রতিষ্ঠানকেও এর মূল্য দিতে হয়। কর্মী অনুপস্থিতি, কর্মী বদলের হার, নতুন কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যয়, গ্রাহকসেবার মান কমে যাওয়া কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল-সবকিছুর সঙ্গে অতিরিক্ত কর্মচাপের সম্পর্ক থাকতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায়ও ব্যাংকারদের চাকরিগত চাপকে কর্মদক্ষতার সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত পাওয়া গেছে।
তাই কর্মীদের সুস্থতা এখন শুধু মানবসম্পদ বিভাগের বিষয় নয়; এটি ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও অংশ। একটি ব্যাংক যখন কোটি কোটি টাকার ঋণ, বিনিয়োগ ও আমানত পরিচালনা করে, তখন সেই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো যাঁরা নেন, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাও প্রতিষ্ঠানের সম্পদের অংশ। একটি ক্লান্ত কর্মীর ভুল হয়তো একটি ছোট হিসাবের ভুল দিয়ে শুরু হতে পারে, কিন্তু ব্যাংকিংয়ের মতো নিয়ন্ত্রিত খাতে ছোট ভুলও কখনো বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
মুনাফার সঙ্গে মানুষের হিসাবও মিলতে হবে
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ব্যাংকে অতিরিক্ত কাজ কখনো হবে না। ব্যাংকিং একটি সময়নির্ভর ও দায়িত্বশীল ব্যবসা। বড় কোনো লেনদেন, জরুরি নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা, প্রযুক্তিগত সমস্যা, বছরের শেষের হিসাব বা বিশেষ পরিস্থিতিতে বাড়তি কাজ প্রয়োজন হতেই পারে। সমস্যা তখনই, যখন ‘জরুরি’ কাজ নিয়মিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয় এবং প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজও অফিস সময়ের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। তখন কর্মীর কাছে অতিরিক্ত সময় আর ব্যতিক্রম থাকে না, হয়ে ওঠে চাকরির অলিখিত শর্ত।
আরেকটি পরিবর্তন আসতে পারে ম্যানেজমেন্ট সংস্কৃতিতে। ভোরের মিটিং বা রাতের কল সত্যিই প্রয়োজনীয় কি না, প্রতিটি রিপোর্ট সেদিন রাতেই শেষ করা জরুরি কি না, একই কাজ আরও দক্ষ প্রযুক্তি দিয়ে কম সময়ে করা যায় কি না-এসব প্রশ্ন করা দরকার। ব্যাংকিংয়ের ডিজিটাল রূপান্তর যদি গ্রাহকের সময় বাঁচাতে পারে, তাহলে সেটি কর্মীদের সময় বাঁচাতেও ব্যবহার করা উচিত। প্রযুক্তির উদ্দেশ্য যদি শুধু আরও বেশি কাজ করানো হয়, তাহলে সেটি কর্মদক্ষতার উন্নয়ন নয়; বরং কাজের চাপকে নতুনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ব্যাংকার কত ঘণ্টা কাজ করছেন, শুধু তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই অতিরিক্ত সময় ব্যাংকের জন্য কতটা মূল্য তৈরি করছে এবং তার বিনিময়ে কর্মী ও প্রতিষ্ঠানকে কতটা মূল্য দিতে হচ্ছে। ঘানার ওই কেস স্টাডি এই প্রশ্নটিকে নাটকীয়ভাবে সামনে এনেছে; বাংলাদেশের গবেষণাও দেখাচ্ছে, ব্যাংকারদের কাজের চাপ বাস্তব এবং তা কর্মদক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্যাংকের মুনাফা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু মূলধন, প্রযুক্তি বা শাখা নেটওয়ার্ক নয়, মানুষও। তাই মুনাফার দৌড় যতই কঠিন হোক, কর্মীদের সময়, স্বাস্থ্য ও দক্ষতাকে সেই হিসাবের বাইরে রাখলে ব্যবসার হিসাবই একসময় অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।

