দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে চিহ্নিত করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। সংস্থাটির তৈরি করা পাঁচ বছরমেয়াদি একটি সংস্কার-কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ঋণ বিতরণ, নিয়োগ-বাণিজ্য এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বাধা তৈরি করাই এখন ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট। বিশেষ করে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এই কৌশলপত্রে আগামী পাঁচ বছরে ব্যাংক খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তার একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের দুর্বল নজরদারি এবং কোনোরকম যাচাই ছাড়াই প্রভাবশালীদের সুবিধা দিয়ে ঋণ দেওয়ার প্রবণতার কারণে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো একরকম ভেঙে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ মঞ্জুর, পদায়ন, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ এমনকি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে এই খাতে। বিগত সরকারের সময়ে ক্ষমতার ঘনিষ্ঠজনেরা বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে ভুয়া নামে-বেনামে ঋণ বের করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে বহুবার। এর ফল ভোগ করছেন সাধারণ আমানতকারীরা, যাঁদের অনেকেই এখন নিজেদের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর নাগাদ দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ সাতান্ন হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় সাড়ে ত্রিশ শতাংশ। এই হার ২০৩১ সালের মধ্যে দশ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে নতুন এই পরিকল্পনায়।
লক্ষ্য পূরণে তিনটি ধাপে এগোনোর কথা বলা হয়েছে কৌশলপত্রে। প্রথম বছরে জোর দেওয়া হবে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর ওপর—ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংক চিহ্নিত করে আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে, বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হবে পরিচালনগত স্বাধীনতা, আর দুর্বল ব্যাংকগুলোকে আনা হবে কড়া নজরদারির আওতায়। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের দ্রুত চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও পরিকল্পনা আছে এই পর্যায়ে। পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য যোগ্যতা যাচাইয়ের একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড চালু করা হবে, আর ব্যর্থ পরিচালনা পর্ষদগুলো ভেঙে নতুন করে গঠন করার প্রস্তাবও রয়েছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরকে ধরা হয়েছে পুনর্গঠনের সময় হিসেবে। এই সময়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত মজবুত করা, ঋণ আদায়ে তদারকি বাড়ানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা পুরোপুরি কার্যকর করা এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর নজরদারি জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্য যাতে দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকতে না পারেন, সে বিষয়েও বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা আছে।
শেষ দুই বছরে নজর দেওয়া হবে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের দিকে। এই পর্যায়ে ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ডিজিটাল বা স্বয়ংক্রিয় করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৌশলপত্র অনুযায়ী, তদারকি ও প্রবিধান-সংক্রান্ত সংস্কারের মূল দায়িত্ব থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে, আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কাজ করবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইনি পরিবর্তনগুলো এক জায়গায় সমন্বয় করার দায়িত্বে। মূলধনের পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি, সম্পদের মান এবং আমানতকারীদের আস্থা—এই সূচকগুলো দিয়েই প্রতিবছর সংস্কারের অগ্রগতি যাচাই করা হবে, আর ২০২৮ অর্থবছরে হবে একটি মধ্যবর্তী পর্যালোচনা।
কৌশলপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, শুধু নতুন করে ঋণ বাড়িয়ে গেলেই বর্তমান সংকট কাটবে না। বরং আগে ঋণ অবলোপন ও খেলাপি ঋণ আদায়ের মধ্য দিয়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা পরিষ্কার করতে হবে। এই কাজ হলে তবেই ব্যাংকগুলো নিরাপদভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি এবং শিল্প খাতের মতো উৎপাদনশীল খাতে নতুন করে ঋণ দিতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও পুনর্গঠনের বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত অর্থে স্বায়ত্তশাসন দিতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একই সঙ্গে যাঁদের কারণে ব্যাংক খাত এই দুরবস্থায় পৌঁছেছে, ভবিষ্যতে যেন কেউ একই ধরনের অনিয়মে জড়াতে সাহস না পান, সে জন্য তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতকে পেশাদারদের হাতে ছেড়ে দিয়ে আস্থা ফেরানো গেলে অর্থায়ন স্বাভাবিক হবে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে যে জটিল সংকটে পড়েছে, তার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। কেবল আইন সংশোধন বা নীতিমালা তৈরি করলেই এই সংকট কাটবে না, বরং তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। পাঁচ বছরের এই রূপরেখা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা।

