দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর প্রক্রিয়া আবারও গতি পেয়েছে। দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া ১২টি আবেদনের মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য বাছাই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী পর্ষদ সভায় এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স অনুমোদনের বিষয়টি তোলা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
নতুন এই ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হবে—প্রচলিত ব্যাংকের মতো কোনো শাখা, উপশাখা বা নিজস্ব এটিএম থাকবে না। মোবাইল ফোন ও অ্যাপের মাধ্যমেই গ্রাহকেরা হিসাব খোলা থেকে শুরু করে টাকা জমা, লেনদেন ও ঋণের আবেদন করতে পারবেন। ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবাও থাকবে।
এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার খরচ কমানো এবং দ্রুত লেনদেনের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা মানুষদেরও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ, তরুণ উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা পেতে পারেন।
তিন বছরে বদলে গেছে মূলধনের শর্ত
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১৪ জুন এ ধরনের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য নীতিমালা প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা।
প্রথম দফায় ৫২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন করেছিল। যাচাই-বাছাই শেষে ৯টি প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদে তোলা হয় এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় আগ্রহপত্র।
তবে এই উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি। প্রথম দফার আবেদনকারীদের মধ্যে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি ২০২৪ সালের জুনে চূড়ান্ত লাইসেন্স পেলেও পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। পরে সেই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। ফলে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর প্রথম উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়।
পরিস্থিতি বদলাতে ২০২৫ সালের আগস্টে নীতিমালায় বড় পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়।
এরপর ২৬ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় আবেদন আহ্বান করা হলে ১২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আগ্রহ দেখায়। এসব আবেদনে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন শর্ত পূরণের বিষয় গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফার আবেদনগুলোর মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পরবর্তী পর্ষদ সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই লাইসেন্স অনুমোদনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
লাইসেন্স পেতে চাওয়া প্রতিষ্ঠান কারা?
ডিজিটাল ব্যাংকের নতুন এই উদ্যোগে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের আগ্রহ দেখা গেছে। মোবাইল আর্থিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, ক্ষুদ্রঋণ, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতের দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এ তালিকায় রয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছে রবি আজিয়াটার ‘বুস্ট’, বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগ ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’, আকিজ রিসোর্সের ‘মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক’, আশার ‘মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক’, ‘আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২’, ‘৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক’, ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, ভুটানের ডিকে ব্যাংকের ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান’, অ্যাপ ব্যাংক, জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক এবং বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক।
তবে এই ১২ আবেদনকারীর মধ্যে ঠিক কোন ৮টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য পর্ষদে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
ডিজিটাল ব্যাংক এলে কী বদলাবে?
ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে। মোবাইল ফোনের অ্যাপ ব্যবহার করেই দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের বেশির ভাগ কাজ করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে ব্যাংকিং সেবার খরচ কমার পাশাপাশি তরুণদের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর ওপরও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অভিজ্ঞ ব্যাংকার মো. আরফান আলীর মতে, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়তে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য শক্তিশালী প্রযুক্তি অবকাঠামো ও সাইবার নিরাপত্তায় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি এবং দেশের অসম্পূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
শুরুতে আরেকটি সমস্যা হতে পারে আমানত সংগ্রহ। বিশেষ করে তরুণ গ্রাহকদের অনেকেরই বড় অঙ্কের সঞ্চয় না থাকায় নতুন ব্যাংকগুলোর জন্য পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহ সহজ নাও হতে পারে।
সব মিলিয়ে, তিন বছরের অপেক্ষার পর যদি আটটি ডিজিটাল ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করতে পারে, তাহলে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। তবে এই নতুন ব্যবস্থার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে গ্রাহকের আস্থা, নিরাপদ প্রযুক্তি এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর।

