চট্টগ্রাম বিভাগের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন পুনর্গঠনে এগিয়ে এসেছে বেসরকারি ব্যাংক এইচএসবিসি বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি মোট ১০ কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা দিয়ে সাত মাসব্যাপী একটি ব্যাপক পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে। এই কর্মসূচির আওতায় থাকবে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, জীবিকা পুনরুদ্ধার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
আজ রোববার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এইচএসবিসির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারী বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোত, পাহাড়ধস ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১০টি জেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিপর্যয়ে মোট ১০ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন, একইসঙ্গে ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির উৎস এবং ফসলি জমি।
এইচএসবিসির অর্থায়নে এই সাত মাসব্যাপী পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। এর মধ্যে ছয় মাস মাঠপর্যায়ে কাজ চলবে এবং বাকি এক মাস ব্যয় হবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরিতে। মূলত তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই কর্মসূচি পরিচালিত হবে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও জীবিকা পুনর্গঠন।
এই কর্মসূচির আওতায় কাজ করা হবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ড, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয় মেরামত ও সংস্কার করা হবে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ। এছাড়া ২৫০টি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, ৪০০টি ল্যাট্রিন মেরামত ও নতুন স্থাপন এবং ৩০টি টিউবওয়েল সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জীবিকা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ৩০০টি আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া হবে, একইসঙ্গে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৬০০টি কৃষক পরিবারকে সরবরাহ করা হবে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ।
অনুষ্ঠানে এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, একটি ব্যাংকের দায়িত্ব কেবল ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। যে জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংক কাজ করে, তাদের জীবনমান উন্নয়নেও ব্যাংক সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরিতেই মূলত এই বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দুর্যোগের পর তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মসূচিতে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে নারীপ্রধান পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবার, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং সমাজের অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। এইচএসবিসি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু-সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এই মানবিক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

