সকাল সাতটা। রাজধানীর কাওরান বাজারের একটি পাইকারি আড়ত। ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। সবজি কেনাবেচায় ব্যস্ত ৫২ বছর বয়সী বিক্রেতা খলিল মিয়া। এক ক্রেতা সবজি কেনার পর বললেন, —“মামা, কিউআর কোডটা দেন, টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি।” খলিল মিয়া কিছুটা অবাক হয়ে বললেন, —“কিউআর কোড আবার কী? নগদ টাকা দেন। মহাজনকে তো নগদেই টাকা দিতে হবে।”
খলিল মিয়ার এই ছোট্ট কথাটিই যেন বাংলাদেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। শহরের ব্যাংক, শপিং মল, রেস্তোরাঁ কিংবা অনলাইন কেনাকাটায় ডিজিটাল লেনদেন দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ টাকা এখনো সবচেয়ে পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য লেনদেনের মাধ্যম।
বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস, মোবাইল ইন্টারনেট, ব্যাংকিং অ্যাপ এবং বাংলা কিউআর—সব মিলিয়ে দেশে তৈরি হচ্ছে একটি বড় ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের প্রান্তিক মানুষ কতটা তাল মেলাতে পারছে?
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে দেশে নিবন্ধিত এমএফএস হিসাবের সংখ্যা ২৩ কোটি ৯০ লাখেরও বেশি। নিয়মিত লেনদেন হওয়া সক্রিয় হিসাবের সংখ্যাও প্রায় ২১ কোটির কাছাকাছি। কোনো কোনো সময় নিয়মিত বা অতি-সক্রিয় গ্রাহক হিসাবের সংখ্যাও ৯ কোটির বেশি হয়েছে। অন্যদিকে, বিটিআরসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যাও প্রায় ১২ কোটি ১০ লাখে পৌঁছেছে।
তবে নিবন্ধিত এমএফএস হিসাবের সংখ্যা মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নয়। একজন ব্যক্তি একাধিক সেবা বা হিসাব ব্যবহার করতে পারেন। তবু এই পরিসংখ্যান দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার বিস্তার সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়।
ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার যতই বাড়ুক, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নগদের ব্যবহার এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পেমেন্ট সিস্টেমস-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, লেনদেনের মূল্যের হিসাবে প্রায় ৬৭ দশমিক ২ শতাংশ এখনো নগদনির্ভর। অর্থাৎ ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো সরাসরি নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীল।
তবে খুচরা বাজারে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার এবং ‘বাংলা কিউআর’ চালুর ফলে দোকানপাট ও মার্চেন্ট পর্যায়ে নগদের ওপর নির্ভরতা কমে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার ফলে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার গ্রাহকদের জন্য ডিজিটালভাবে মূল্য পরিশোধের সুযোগও সহজ হচ্ছে। অর্থাৎ, হাতে স্মার্টফোন থাকা আর ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হওয়া—দুটি বিষয় এক নয়।
বাংলাদেশের এমএফএস ব্যবস্থার দিকে তাকালেও এই বাস্তবতা আরও পরিষ্কার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস-সংক্রান্ত গবেষণা অনুযায়ী, বছরে এমএফএস লেনদেনের পরিমাণ ১৭ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি। এর প্রায় ৫৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১০ দশমিক ৭৯ ট্রিলিয়ন টাকা, ক্যাশ-ইন ও ক্যাশ-আউটের মাধ্যমে ঘোরাফেরা করে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই টাকা শেষ পর্যন্ত নগদে পরিণত করার প্রবণতাও প্রবল। অর্থাৎ ডিজিটাল অর্থনীতির দরজা খুলেছে, কিন্তু অনেকের কাছে নগদ এখনো সেই দরজা দিয়ে বের হওয়ার প্রধান পথ।
কেন নগদ ছাড়তে পারছে না প্রান্তিক মানুষ? এর পেছনে শুধু প্রযুক্তির অভাব দায়ী নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভ্যাস, আস্থা, খরচ, অবকাঠামো এবং আর্থিক ব্যবস্থার বাস্তব কাঠামো।
প্রথম সমস্যা ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি। শহরের তরুণরা কয়েকটি ট্যাপেই টাকা পাঠাতে পারে। কিন্তু গ্রামের একজন কৃষক, বয়স্ক মানুষ কিংবা ছোট দোকানদারের কাছে পিন, ওটিপি, কিউআর স্ক্যান, অ্যাপ কিংবা বিভিন্ন লিংকের ব্যবহার এখনো জটিল মনে হতে পারে। অনেকের হাতে স্মার্টফোন থাকলেও সেটি মূলত ফোন করা, ফেসবুক, ইউটিউব বা মেসেজিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে প্রযুক্তি হাতে পৌঁছালেও প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
দ্বিতীয় বড় বিষয় আস্থার সংকট। হাতে থাকা ৫০০ টাকার নোট একজন মানুষ চোখে দেখতে পারেন। কিন্তু মোবাইলের পর্দায় কয়েকটি সংখ্যা দেখিয়ে বলা হলে যে টাকা তার অ্যাকাউন্টে এসেছে, সেটি অনেকের কাছে একই রকম দৃশ্যমান নিরাপত্তা তৈরি করে না। এর সঙ্গে রয়েছে ভুল নম্বরে টাকা চলে যাওয়া, প্রতারণা, ভুয়া কল, পিন বা ওটিপি চুরি এবং লেনদেন আটকে যাওয়ার ভয়।
একজন দিনমজুরের ২০০ টাকা কয়েক ঘণ্টার জন্য আটকে গেলেও সেটি তার পরিবারের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই প্রযুক্তিগত সুবিধার পাশাপাশি মানুষের মনে নিরাপত্তার বিশ্বাস তৈরি করাও জরুরি। ক্যাশলেস অর্থনীতির আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কে বহন করবে?
বড় অঙ্কের টাকা ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠানো সহজ হলেও ৫০, ১০০ বা ২০০ টাকার মতো ছোট লেনদেনে অতিরিক্ত চার্জ অনেকের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট লেনদেনের সামান্য চার্জও মাস শেষে উল্লেখযোগ্য ব্যয়ে পরিণত হতে পারে।
তাই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে ক্ষুদ্র অঙ্কের লেনদেনে আরও কম খরচ, কিংবা নির্দিষ্ট সীমার নিচে শূন্য বা খুব কম ফি রাখার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির জন্য বাংলা কিউআর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। একটি অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবার গ্রাহক একই কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার বিস্তার দ্রুত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার মার্চেন্ট বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছিল। একই সময়ে ৪৬টি ব্যাংক, ৭টি এমএফএস এবং ৪টি পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ২০২৫ সালে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেনও হয়েছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে আন্তঃসেবাভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবার মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ আরও বিস্তৃত হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সব মার্চেন্ট পয়েন্টে নিজস্ব বা proprietary QR code-এর পরিবর্তে একক মান হিসেবে ‘বাংলা QR’ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলাদা QR-এর বদলে মার্চেন্টদের জন্য একটি অভিন্ন QR ব্যবস্থার দিকে দেশ এগিয়েছে।
তবে দোকানে কিউআর কোড বসিয়ে দিলেই কাজ শেষ হবে না। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে জানতে হবে কীভাবে সেটি ব্যবহার করতে হয়, টাকা এসেছে কি না যাচাই করতে হয় কীভাবে এবং সমস্যায় পড়লে কোথায় অভিযোগ করতে হবে।
ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও রয়েছে আলাদা চ্যালেঞ্জ। অনেক পরিবারের নারীর নিজস্ব স্মার্টফোন নেই। আবার মোবাইল আর্থিক হিসাব থাকলেও সেটির নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় পরিবারের অন্য সদস্যের হাতে থাকে। এতে একজন নারী উদ্যোক্তা, কৃষিশ্রমিক কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নিজের আয় নিজের মতো করে পরিচালনার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে, এজেন্ট ব্যাংকিং ইতোমধ্যে গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত কম-সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও গ্রামীণ নারী গ্রাহকদের বড় অংশগ্রহণ দেখা যায়। অতএব, ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়তে শুধু প্রযুক্তি নয়, ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্যাশলেস লেনদেনের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ এবং দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা। শহরে কয়েক সেকেন্ডের নেটওয়ার্ক সমস্যাকে হয়তো সামলে নেওয়া যায়। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানদার বা কৃষকের জন্য দুর্বল নেটওয়ার্ক কিংবা বিদ্যুৎ না থাকা সরাসরি ব্যবসায়িক সমস্যায় পরিণত হতে পারে। তাই ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারের সঙ্গে গ্রাম ও মফস্বলে নির্ভরযোগ্য মোবাইল নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে জরুরি হলো বিকল্প ব্যবস্থা রাখা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা নেটওয়ার্ক সমস্যার সময় যদি ডিজিটাল লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে প্রান্তিক মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। ফলে ক্যাশলেস ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি কার্যকর নগদভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে শুধু অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপা।একজন মানুষের এমএফএস অ্যাকাউন্ট আছে কি না, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—তিনি সেটি নিয়মিত কী কাজে ব্যবহার করছেন। টাকা পাঠানো, বিল দেওয়া, দোকানে মূল্য পরিশোধ, সরকারি ভাতা গ্রহণ কিংবা সঞ্চয়ের মতো দৈনন্দিন কাজে ডিজিটাল সেবা ব্যবহার না বাড়লে শুধু অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়িয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতি তৈরি করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণাতেও দেখা যাচ্ছে, ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার ঘটলেও নগদ এখনো খুচরা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আন্তঃসেবাভিত্তিক পেমেন্ট, বাংলা কিউআর এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন এই ব্যবধান কমাতে পারে, কিন্তু এর জন্য ব্যবহারকারীর আস্থা ও মার্চেন্ট গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো জরুরি।
অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু ‘ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট বাড়ানোর’ লক্ষ্য নয়; বরং ‘ডিজিটাল ব্যবহারের অভ্যাস বাড়ানোর’ চ্যালেঞ্জ। নগদ থেকে ডিজিটালে এই পরিবর্তন যত বেশি দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে পড়বে, ততই একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাশলেস অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
প্রথমত, ক্ষুদ্র লেনদেনের খরচ কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইউনিয়ন, বাজার, হাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে হাতে-কলমে ডিজিটাল আর্থিক শিক্ষা চালু করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, অ্যাপগুলোকে আরও সহজ করতে হবে। স্থানীয় ভাষা, সহজ আইকন, ভয়েস নির্দেশনা এবং প্রবীণ বা কম-শিক্ষিত ব্যবহারকারীদের উপযোগী নকশা ডিজিটাল সেবার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
চতুর্থত, ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাসকে যথাযথ যাচাই ও নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় এনে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আর্থিক পরিচিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে, মার্চেন্ট পর্যায়ে একটি অভিন্ন ও সহজ পেমেন্ট অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন ক্রেতা ডিজিটালভাবে টাকা দিতে চাইলেও যদি দোকানদার তা গ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আগামীকাল সকালেই নগদ অর্থ অদৃশ্য হয়ে যাবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত ধীরে ধীরে এমন একটি ‘ক্যাশ-লাইট’ অর্থনীতি তৈরি করা, যেখানে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নগদ থাকবে, কিন্তু দৈনন্দিন অধিকাংশ লেনদেন নিরাপদ, সহজ ও কম খরচে ডিজিটাল মাধ্যমে করা সম্ভব হবে।
ক্যাশলেস সমাজের আসল সাফল্য কতগুলো কিউআর কোড দোকানে লাগানো হলো, কতগুলো এমএফএস হিসাব খোলা হলো কিংবা কত কোটি টাকা ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন হলো—শুধু তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। সাফল্য তখনই আসবে, যখন কাওরান বাজারের খলিল মিয়াও নিজের প্রয়োজন বুঝে বলবেন— “নগদ থাকুক, তবে কিউআরেও টাকা নিতে পারি।”
সেই দিনই বোঝা যাবে, ডিজিটাল অর্থনীতি শুধু শহরের প্রযুক্তিবান্ধব মানুষের জন্য নয়; বরং কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা, প্রবীণ এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষকেও সঙ্গে নিয়ে এগোচ্ছে। ক্যাশলেস বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাই নগদকে একদিনে বিদায় দেওয়া নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত—কাউকে বাদ না দিয়ে এমন একটি ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জন্য সহজ হবে, মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়

