বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এজেন্ট ব্যাংকিং এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের নাম। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে এই ব্যবস্থা বড় ভূমিকা রাখছে। যেখানে প্রচলিত ব্যাংকের শাখা স্থাপন করা কঠিন, সেখানে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সহজেই টাকা জমা, উত্তোলন, হিসাব খোলা, রেমিট্যান্স গ্রহণসহ বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা নির্দিষ্ট এলাকায় ব্যাংকের হয়ে সেবা প্রদান করেন। ফলে দূরের ব্যাংক শাখায় না গিয়েও গ্রামের মানুষ নিজেদের এলাকার কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। এর ফলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় হিসাব খোলার জটিলতা, দূরত্ব এবং সময়ের সীমাবদ্ধতা অনেক মানুষকে ব্যাংকিং সেবার বাইরে রেখেছিল। এজেন্ট ব্যাংকিং সেই বাধাগুলো অনেকটাই দূর করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ৩০টি ব্যাংক ১৫ হাজার ৪২৪ জন এজেন্ট এবং ২০ হাজার ৫৯৭টি আউটলেটের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে অধিকাংশ এজেন্ট ও আউটলেট রয়েছে গ্রামীণ এলাকায়।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতি আরও সক্রিয় হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দেশের মূল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে এই ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হিসাব খোলার প্রবণতাও দ্রুত বাড়ছে। জুন শেষে এই ব্যবস্থায় মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ২৫৬টি। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকার হিসাব রয়েছে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ, যা মোট হিসাবের প্রায় ৮৫ শতাংশ। একই সময়ে নারী গ্রাহকদের হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখের বেশি।
এই খাতে আমানতের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৯০৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বড় অংশ এসেছে গ্রামীণ অঞ্চল থেকে। গ্রামের মানুষ এখন শুধু টাকা জমা রাখছেন না, বরং ধীরে ধীরে সঞ্চয়ের অভ্যাসও গড়ে তুলছেন।
প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স বিতরণেও এজেন্ট ব্যাংকিং বড় ভূমিকা পালন করছে। আগে অনেক গ্রামীণ পরিবারকে রেমিট্যান্স তুলতে দূরের ব্যাংক শাখায় যেতে হতো। এখন স্থানীয় এজেন্ট আউটলেট থেকেই দ্রুত ও সহজে অর্থ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে।
জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা অন্তর্মুখী রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি অর্থ গ্রামীণ পরিবারের হাতে পৌঁছেছে। এর ফলে গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং নারীদের আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। নারী গ্রাহকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো পুরুষদের তুলনায় তারা পিছিয়ে আছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা বাড়ানো গেলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন আরও জোরদার হবে।
বর্তমানে দেশের ৩০টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনা করলেও খাতটির বড় অংশ কয়েকটি শীর্ষ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক এবং আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এই খাতে বড় ভূমিকা রাখছে। এসব ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানো সহজ হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশেও এজেন্ট ব্যাংকিং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি কার্যকর মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্রাজিল, কেনিয়া, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া ও পেরুর মতো দেশে এই ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশেও এজেন্ট ব্যাংকিং এখন শুধু টাকা লেনদেনের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এই খাতকে আরও কার্যকর করতে হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও নারী ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি আরও বেশি ব্যাংককে এই ব্যবস্থায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

