প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে কিস্তি জমা দেওয়া একজন গ্রাহক যখন ব্যাংকের সামনে লাইনে দাঁড়ান, তখন তার পাশের ডেস্কেই হয়তো আরেকজন গ্রাহক আলোচনা করছেন কীভাবে বছরের পর বছর অপরিশোধিত ঋণের সুদ পুরোপুরি মাফ করিয়ে, শুধু আসলের একটা অংশ একবারে জমা দিয়ে “ঋণমুক্ত” হয়ে যাওয়া যায়। এই দুই দৃশ্য কোনো কল্পকাহিনি নয়; ২০২৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সার্কুলার এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছে। জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন একটি “স্পেশাল এক্সিট” সুবিধা চালু করেছে, যেখানে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণগ্রহীতারা সুদ মওকুফ পেয়ে এক কিস্তিতে দায় মিটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠছে, যিনি নিয়মিত সুদ ও কিস্তি দিয়ে গেছেন, তার জন্য কী থাকল, আর যিনি বছরের পর বছর দেননি, তিনিই বা কেন সুবিধা পাচ্ছেন?
সংখ্যাটা কীভাবে এত বড় হলো
এই খেলাপি ঋণের চিত্র কিন্তু হঠাৎ তৈরি হয়নি। ডিসেম্বর ২০২৪ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশ। মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে, সেপ্টেম্বর ২০২৫ নাগাদ তা রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছে যায়; যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর কিছুটা কমে ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে, কিন্তু মার্চ ২০২৬ নাগাদ তা আবার বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং জুন শেষে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী এই হার এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ, এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকেও ছাড়িয়ে গেছে, যে দেশটি ২০২২ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের মধ্যে থেকেও ঋণ পুনরুদ্ধার ও অবলোপনের মাধ্যমে তাদের খেলাপি হার ২০২৬ সালের জুলাই নাগাদ ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই বিশাল উত্থানের মূল কারণ লুকানো ছিল না, বরং তা প্রকাশ পেয়েছে। আগের সরকারের আমলে বহু সমস্যাগ্রস্ত ঋণ বারবার পুনঃতফসিলিকরণ, বিশেষ ছাড় ও হিসাবরক্ষণের কৌশলের মাধ্যমে নিয়মিত হিসেবে দেখানো হয়েছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ মান পর্যালোচনা (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) ও নিরীক্ষায় সেই লুকানো অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেনামি ঋণ একে একে সামনে চলে আসছে।
এক্সিটের নামে কী দেওয়া হচ্ছে
এই বিপুল খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক জুন ২০২৬ শেষে ফের একটি “স্পেশাল এক্সিট” নীতি চালু করে, যা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সুবিধার আওতায় ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত “মন্দ” ও “ক্ষতিজনক” শ্রেণিতে পড়া ঋণগুলো এক কিস্তিতে পরিশোধ করলে ব্যাংক প্রযোজ্য ও অপ্রযোজ্য উভয় ধরনের সুদ মওকুফ করতে পারবে, এমনকি তহবিল ব্যয় পুনরুদ্ধারের স্বাভাবিক শর্তও শিথিল করা হয়েছে। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে “মন্দ ও ক্ষতিজনক” শ্রেণির ঋণের পরিমাণই ছিল ৫ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ সমস্যা কতটা গভীরে, তা এই একটি সংখ্যাতেই স্পষ্ট। এর আগেও ২০২৪ সালে একটি এক্সিট নীতি চালু হয়েছিল, যেখানে ঋণের ১০ শতাংশ জমা দিয়ে বাকিটা তিন বছরে শোধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
একইসঙ্গে অবলোপন নীতিতেও একের পর এক ছাড় এসেছে; আগে যেখানে “মন্দ ও ক্ষতিজনক” শ্রেণিতে অন্তত তিন বছর থাকা ঋণ অবলোপনযোগ্য ছিল, তা কমিয়ে দুই বছর করা হয়, পরে শতভাগ প্রভিশন রাখা সাপেক্ষে সময়সীমাই তুলে দেওয়া হয়। ডিসেম্বর ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো আংশিক অবলোপনেরও অনুমতি দেওয়া হয়, যাতে পুরো ঋণ অবলোপন না করেও আদায়যোগ্য অংশ ব্যালান্স শিটে রেখে বাকিটা সরিয়ে ফেলা যায়। এসব পরিবর্তনের পেছনে যুক্তি হলো ব্যাংকের ব্যালান্স শিট স্বচ্ছ করা ও নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, তবে এই একই যুক্তিতে বারবার ছাড় দেওয়ার ইতিহাসও কম দীর্ঘ নয়।
আইনি পথে যেভাবে সময় কেনা হয়
শুধু নীতিগত ছাড়ই নয়, খেলাপিদের হাতে আরেকটি শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে, আদালত। অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ অনুযায়ী ঋণ আদায়ের মামলা সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য অনুযায়ী বহু মামলা ৮ থেকে ১০ বছর ধরে ঝুলে আছে। এর একটি বড় কারণ, অর্থঋণ আদালতের রায় বা প্রক্রিয়ায় অসন্তুষ্ট হলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতে রিট করার সুযোগ রয়েছে, এবং সেখান থেকে স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) নিয়ে আসল আদায় প্রক্রিয়া বছরের পর বছর আটকে রাখা যায়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি) নিজেরাই স্বীকার করেছে, খেলাপিরা এই রিট-সংস্কৃতিকে সুকৌশলে ব্যবহার করছেন আদায় প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে। অর্থাৎ একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ছাড়, অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা; দুই দিক থেকেই সময় খেলাপির পক্ষে কাজ করছে, আর নিয়মিত গ্রাহকের কাছে এই সুযোগের কোনোটাই নেই, কারণ তার তো খেলাপ করারই প্রশ্ন ওঠে না।
ইতিহাস যা বলছে
এই এক্সিট নীতি নতুন কোনো পরীক্ষা নয়। ২০১৯ সালেও একবার বড় আকারের ঋণ পুনঃতফসিল ও ছাড়ের প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল, যার আওতায় ৫০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয় এবং তাতে খেলাপি হার সাময়িকভাবে চার বছরের সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ১৯ শতাংশে নেমে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, যারা সেই সুবিধা নিয়েছিলেন তাদের বড় অংশই নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ চালিয়ে যাননি, ফলে তারা আবার খেলাপিতে পরিণত হন। তখন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি তাদের প্রতিবেদনে এই নীতিকে “বরোআরস-এর বিকৃত আচরণকে উৎসাহিত করার সুবিধা” বলে কড়া সমালোচনা করেছিল এবং লক্ষ করেছিল, নিয়মিত পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের জন্য প্রণোদনা খেলাপিদের দেওয়া সুবিধার তুলনায় নগণ্য। অর্থনীতিতে এটিকে বলা হয় “মোরাল হ্যাজার্ড” অর্থাৎ কেউ যদি জানেন যে খারাপ আচরণের পরও শেষ পর্যন্ত একটি নিরাপদ প্রস্থানপথ থাকবে, তাহলে তার সেই আচরণ পরিবর্তনের প্রণোদনা কমে যায়। এটি কোনো ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং ঋণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক নীতি, যা বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং তত্ত্বেই স্বীকৃত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরীও একই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বারবার এমন ছাড় “নতুন প্রজন্মের দায়িত্বজ্ঞানহীন ঋণগ্রহীতা” তৈরি করতে পারে এবং ব্যাংক পরিচালকদের হাতে সুদ মওকুফের ক্ষমতা ছেড়ে দিলে তা নিজেদের স্বার্থেই ব্যবহৃত হতে পারে।
সৎ গ্রাহক ও আমানতকারীর হিসাবটা কোথায়
এবার আসা যাক সংখ্যার আরেক পিঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তফসিলি ব্যাংকগুলোর ঋণের ভারযুক্ত গড় সুদহার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ, আর আমানতের ওপর গড় সুদহার ছিল মাত্র ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ যিনি ব্যাংকে টাকা রাখছেন, তিনি ৬ শতাংশের কিছু বেশি মুনাফা পাচ্ছেন, আর যিনি নিয়মিত ঋণ শোধ করছেন তাকে ১২ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে, কোনো ছাড় বা মওকুফ ছাড়াই। এই সুদহারের ব্যবধান আসলে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়, ঝুঁকি সঞ্চিতি (প্রভিশন) এবং খেলাপি ঋণের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া; সহজ কথায়, একজন খেলাপি যে সুদ মাফ পাচ্ছেন, তার একটা অংশের বোঝা শেষ পর্যন্ত নিয়মিত গ্রাহক ও আমানতকারীর ওপরই ঘুরে-ফিরে চাপে, কারণ ব্যাংককে টিকে থাকতে হলে এই ক্ষতি কোনো না কোনোভাবে পুষিয়ে নিতেই হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইনের মূল কাঠামো বলে, ঋণ একটি চুক্তিভিত্তিক দায়, যেখানে গ্রহীতা নির্দিষ্ট শর্তে অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য। এই নীতিগত ভিত্তিতেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। যখন এই মৌলিক নীতিই বারবার নীতিগত ছাড়ের মাধ্যমে শিথিল হতে থাকে, তখন যারা চুক্তি মেনে চলেছেন তাদের কাছে বার্তাটা কী দাঁড়ায়, তা ভেবে দেখার বিষয়।
সামনে কী করণীয়
তবে এর মানে এই নয় যে সব ঋণ পুনর্গঠন বা এক্সিট নীতিই খারাপ। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের মতো ব্যাংকাররা মনে করেন, বছরের পর বছর অনাদায়ী ঋণ বহন করার চেয়ে একবারের ছাড়ে হলেও প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া গ্রাহককে বের করে দেওয়া বাস্তবসম্মত পথ; শর্ত থাকে অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রশ্নটা তাই “ছাড় দেওয়া উচিত কি না” তা নয়, বরং “কাকে এবং কীভাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে” তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বিমা বিভাগের অধ্যাপক মাঈন উদ্দিনের পর্যবেক্ষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ; তার মতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা যতই সুবিধা দেওয়া হোক না কেন ঋণ শোধ করবেন না, তাই ব্যাপক নীতির বদলে শীর্ষ ২০-২৫ জন বড় খেলাপির বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি কার্যকর হতে পারে। এর সঙ্গে অর্থঋণ আদালতের বিচারক সংখ্যা বাড়ানো, রিট আবেদনের অপব্যবহার রোধে সুনির্দিষ্ট আইনি সংস্কার, এবং এক্সিট সুবিধা নেওয়ার পরও যারা আবার নিয়মিত পরিশোধে ব্যর্থ হন তাদের জন্য কঠোরতর শর্ত যুক্ত করা গেলে, তবেই “ভালো গ্রাহক পান কিস্তির বোঝা, খেলাপি পান ছাড়ের পুরস্কার” এই সমীকরণ কিছুটা হলেও বদলাতে পারে। নইলে পরিসংখ্যান যা বলছে, তাতে আগামী কয়েক বছরেও এই চক্র নতুন নামে, নতুন সার্কুলারে ফিরে আসার আশঙ্কাই বেশি।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

