গাড়ি-বাড়ি কেনা থেকে শুরু করে বিদেশ ভ্রমণ কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে টাকা পাঠানো—এসব ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও ক্রেডিট কার্ড ঋণেও এসেছে বড় ছাড়। সবশেষ রোববার বিদেশ ভ্রমণের জন্য বছরে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা বারো হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে আঠারো হাজার ডলারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মূলত মানুষের আয়ের সঙ্গে খরচের মিল রেখে জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ করে দিতেই এই ধরনের একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। আর এসব সুযোগ চালু হওয়ার পর থেকে ব্যাংকগুলোতে ঋণের চাহিদাও লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে।
ভোক্তা ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড সেবায় এগিয়ে থাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকের ভোক্তা ঋণ বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, গ্রাহকদের জন্য বেশ কিছু নীতিমালা আগের চেয়ে সহজ করা হয়েছে, যার ফলে সামর্থ্যবান গ্রাহকদের জীবনযাত্রা আগের চেয়ে স্বচ্ছন্দ হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর জন্যও এই খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ রোববার নতুন এই সিদ্ধান্ত নেয়। এখন থেকে বিদেশ ভ্রমণে একজন ব্যক্তি বছরে সর্বোচ্চ আঠারো হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে পারবেন, যার মধ্যে একবারে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ডলার নগদে তোলা যাবে, বাকিটা কার্ডে ব্যবহার করতে হবে। সিদ্ধান্ত জানার পরপরই অনেক গ্রাহক নিজেদের ডলার সীমা বাড়িয়ে নিতে ব্যাংকের শাখায় ভিড় করছেন বলে জানা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ভ্রমণ-সংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ধরন পাল্টে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এই সীমা বাড়ানো হয়েছে। নতুন সীমা প্রতি ক্যালেন্ডার বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে বারো বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল থাকছে—তারা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত সীমার অর্ধেক পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এই পদক্ষেপে পর্যটন, স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা কিংবা অন্যান্য বৈধ কারণে বিদেশযাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মেটানো আগের চেয়ে সহজ হবে। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রেডিট কার্ডে ঋণসীমা বাড়ানোর পর ভ্রমণ কোটাও বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছিল, আর সেই প্রয়োজন থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের একজন প্রধান কর্মকর্তা বলেন, নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণকারীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত স্বস্তির, কারণ এখন তারা আরও নির্বিঘ্নে খরচ করতে পারবেন।
ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এখন জামানত ছাড়াই বিশ লাখ টাকা এবং জামানত দিয়ে চল্লিশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাচ্ছে, যার সর্বোচ্চ সুদহার পঁচিশ শতাংশ। অথচ আগে জামানত ছাড়া সর্বোচ্চ বিশ লাখ টাকাই ছিল ঊর্ধ্বসীমা।
এ বছরের মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে নির্দেশনা দিয়েছিল, ব্যাংকগুলো জামানতহীন দশ লাখ ও জামানতসহ পঁচিশ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ড ঋণ দিতে পারবে। পরে সেই সীমা আরও বাড়িয়ে যথাক্রমে বিশ লাখ ও চল্লিশ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি কার্ডধারীরা এখন তাদের মোট ঋণসীমার অর্ধেক পর্যন্ত অর্থ নগদে তুলতেও পারছেন।
এসবের পাশাপাশি মে ও জুন মাসেও ভোক্তা ঋণের অঙ্ক ও মেয়াদ বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগে সর্বোচ্চ বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত ভোক্তা ঋণ মিলত, এখন তা বেড়ে চল্লিশ লাখ টাকা হয়েছে। আর ঋণ পরিশোধের সময়সীমাও পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে আট বছর করা হয়েছে, ফলে দীর্ঘ মেয়াদে কিস্তির বোঝা তুলনামূলক হালকা হয়ে এসেছে।
ভিসা-জটিলতার কারণে অনেক রোগী এখন ভারতের বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। এসব দেশে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বেশি পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন পড়ছে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বিদেশে চিকিৎসা খাতে ডলার পাঠানোর সীমাও বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে বিশেষ অনুমতি ছাড়াই পনেরো হাজার ডলার পর্যন্ত চিকিৎসা খরচ বিদেশে পাঠানো যাবে। এর চেয়ে বেশি অর্থ পাঠাতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতি নিতে হবে। এর আগে এই সীমা ছিল মাত্র দশ হাজার ডলার।
জিনিসপত্রের দাম ও চাহিদা বাড়ায় গাড়ি কেনার ঋণসীমাও বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগে একটি গাড়ি কিনতে সর্বোচ্চ চল্লিশ লাখ টাকা ঋণ মিলত, এখন তা বেড়ে ষাট লাখ টাকা হয়েছে। পাশাপাশি গাড়ির দামের কত অংশ ঋণ হিসেবে নেওয়া যাবে, সেই হারও বাড়ানো হয়েছে—সাধারণ গাড়ির ক্ষেত্রে আগের পঞ্চাশ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ষাট শতাংশ, আর হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে সত্তর শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আবাসন খাতেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে ফ্ল্যাটের দাম ও নির্মাণ ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনার ঋণসীমা দুই কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে চার কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে এই সুবিধা সব ব্যাংকের জন্য সমান নয়—যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার পাঁচ শতাংশের নিচে, তারাই সর্বোচ্চ চার কোটি টাকা পর্যন্ত আবাসন ঋণ দিতে পারবে। আর যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পাঁচ থেকে দশ শতাংশের মধ্যে, তারা দিতে পারবে সর্বোচ্চ তিন কোটি টাকা পর্যন্ত।
সব মিলিয়ে, ঋণ ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একের পর এক শিথিল হওয়া এসব নিয়ম সামগ্রিকভাবে সামর্থ্যবান গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর বয়ে আনলেও, এর প্রকৃত প্রভাব কতটা ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পড়বে, তা নিয়ে সময়ই দেবে চূড়ান্ত উত্তর।

