ব্যাংকঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের সঠিক মূল্য নির্ধারণে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের জামানত মূল্যায়নের কাজে যুক্ত থাকার জন্য মোট একশ একত্রিশটি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এসব তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই জামানতের মূল্য যাচাই করাতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় এই তথ্য জানানো হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধিত একটি ধারার আওতায় এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
তালিকাভুক্ত এই একশ একত্রিশটি প্রতিষ্ঠানকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—আটানব্বইটি প্রতিষ্ঠান প্রথম শ্রেণিতে এবং তেত্রিশটি প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্থান পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই হাজার তেইশ সালের নভেম্বরে জারি করা একটি সার্কুলারের মাধ্যমে জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই নীতিমালা অনুসরণ করেই এবার যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাছাই করে তালিকাভুক্ত করা হলো।
নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রক্রিয়াধীন কিংবা ইতিমধ্যে অনুমোদিত যেকোনো ঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের মূল্যায়ন এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়ে সময়ে জারি করা অন্যান্য নির্দেশনাও যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
তালিকাভুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শর্ত বা নির্দেশনা যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থ হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমনকি যুক্তিসংগত কোনো কারণ দেখা দিলেও যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে অতালিকাভুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে নীতিমালায়। তালিকাভুক্ত থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই নবায়নের জন্য আবেদন করতে হবে, এবং প্রতিবছর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নির্ধারিত ছকে একটি প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের সঠিক ও যথাযথ মূল্যায়ন আসলে সামগ্রিক ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগ্যতা ও শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করার ফলে জামানতের মূল্য নির্ধারণে আরও শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আসবে বলে তারা মনে করছেন। পাশাপাশি অতিমূল্যায়নের মতো ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসতে পারে বলে তাদের অভিমত।
প্রথম শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ইন্সপেকশন অ্যান্ড সার্ভে, মল্লিক অ্যাডজাস্টার্স, সেবোল্ট অ্যাডজাস্টার্স, সিটি ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সপেকশন, জরিপ ও পরিদর্শন, ডিজিটাল জরিপ ও পরিদর্শন, পদ্মা টেকনো-কনসাল্ট, ইস্টল্যান্ড সার্ভেয়ার্স, মৃধা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস, বাল্টিক কন্ট্রোল, ল্যান্ড সার্ভে, মুনালিসা সার্ভে, এমএসকে ইন্সপেকশন, জেডএএসএস সার্ভে, আমানাহ সার্ভে, প্রফেশনাল সার্ভে, ফ্রিডম ইন্সপেকশন সার্ভিস, নান্দনিক বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্সপেকশন সার্ভে, শতাব্দী বিল্ডার্স, সততা সার্ভে, উইজ কনসাল্টিং, ন্যাশনাল সার্ভে, সার্ভে ফর ভ্যালুয়েশন, কমোডিটি ইন্সপেকশন, তাজ ইন্সপেকশন অ্যান্ড সার্ভে, সাউথ বাংলা সার্ভেয়ার্স, সোনালী ইন্সপেকশন, জাবির সার্ভে অ্যান্ড কনসালট্যান্সি, কম্পাস সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন, পূর্বাশা ইন্সপেকশন, আইআইএস কনসাল্টিং, ভেনাস ইন্সপেকশন, ময়নামতি সার্ভে, টোটাল সার্ভে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সপেকশন, ডিজিটাল সার্ভে, ট্রাস্ট ইন্সপেকশন, লিবার্টি সার্ভে, জিওটিক সার্ভে, মাতৃ সার্ভে ইন্সপেকশন, প্রিন্স ইন্সপেকশন, স্বাধীন বাংলা সার্ভে, রহমান ইন্সপেকশন, প্রমিস সার্ভেয়ার্স, বিজনেস সার্ভে, প্রাইম ইন্সপেকশন, বেলমন্ট ইন্সপেকশন, রয়্যাল ইন্সপেকশন, নর্দার্ন ইন্সপেকশন, ইমার্জেন্সি সার্ভে, রেডিয়াস ইন্সপেকশন, অ্যাকটিভ ইন্সপেকশন, ফার্স্ট ইন্সপেকশন, ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্সি, প্যাসিফিক সার্ভেয়ার্স, রিয়েল ইন্সপেকশন, ইউনিক সার্ভে, কাপাসিয়া ইন্সপেকশন, ইসমাইল অ্যাডজাস্টার্স, দোয়েল সার্ভে, জিও সার্ভে, সিটি সার্ভে, সুপার ইন্সপেকশন, মিশন সার্ভে, ক্রিয়েটিভ সার্ভে, আনিক সার্ভে অ্যান্ড রিকভারি, ডিসেন্ট ম্যানেজমেন্ট, জনতা ইন্সপেকশন, নিহান ইঞ্জিনিয়ারিং, ইয়োমি কনসাল্টিং, পারফেক্ট ইন্সপেকশন, মডার্ন সার্ভেয়ার্স, ফেয়ারডিল সার্ভেয়ার্স, এএমকে অ্যাসোসিয়েটস, কিউবিট সার্ভে, পপুলার রিয়েল সার্ভে ও মুনলাইট ইন্সপেকশনের মতো প্রতিষ্ঠান।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে জামানতের অতিমূল্যায়নের অভিযোগ ছিল, যা প্রকারান্তরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছিল। এই প্রেক্ষাপটে স্বীকৃত ও তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জামানত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করার এই সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

