দেশের দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংক খাতকে পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিশ্বব্যাংক থেকে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৫২২ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের সংস্কার, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় গড়ে তুলতেই এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
ঋণের সঙ্গে যুক্ত কারিগরি সহায়তা প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি আগামী সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’ নামের প্রকল্পটি বাংলাদেশ ব্যাংক বাস্তবায়ন করবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে চলা এই প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
বিশ্বব্যাংকের অনুমোদিত মোট কার্যক্রমের আকার ৪৫২ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে দিচ্ছে সংস্থাটি। গত জুনে এ ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়। বাকি অংশের মধ্যে ১০১ মিলিয়ন ডলার কারিগরি সহায়তার জন্য রাখা হয়েছে।
ঋণের ৩৪০ মিলিয়ন ডলার সরাসরি ব্যাংক খাতের সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ২৪টি কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিপরীতে ছাড় করা হবে। এই অর্থ জমা হবে ডিপোজিট প্রোটেকশন ফান্ড বা আমানত সুরক্ষা তহবিলে। তবে এই অর্থ ব্যবহারের আগে সরকারকে ডিপোজিট প্রোটেকশন আইন সংশোধন করতে হবে। সংশোধিত আইনে ব্যাংক পুনর্গঠনের সময় এই তহবিল কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককে পর্যাপ্ত জনবল নিয়ে একটি পৃথক ডিপোজিট প্রোটেকশন বিভাগ গঠন করতে হবে।
শর্তসাপেক্ষে বরাদ্দ করা ৩৪০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৬০ মিলিয়ন ডলার যাবে আমানত সুরক্ষা ও ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতিতে। ব্যাংক পুনর্গঠন ও রেজল্যুশনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১২০ মিলিয়ন ডলার। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কারে ব্যয় করা হবে ৬০ মিলিয়ন ডলার।
আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারকে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সরকারি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে তহবিল পরিচালনার জন্য নতুন বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ, তহবিলের কাঙ্ক্ষিত আকার নির্ধারণ, আমানতকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং দ্রুত আমানতের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলার শর্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংককে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। সংকটে পড়লেও যেসব ব্যাংক কার্যকরভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাদের জন্য স্বচ্ছ জরুরি তারল্য সহায়তা কাঠামো তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে দেওয়া বিভিন্ন সহায়তা এবং ‘ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ সুবিধার বকেয়া অর্থ ফেরতের জন্য সময়সীমাভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, আমানত বিমার প্রিমিয়াম কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এবং সরকারের আর্থিক সহায়তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে দায়িত্ব, অর্থের উৎস ও সময়সীমা উল্লেখ করে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। তাঁর মতে, পরিকল্পনাটি কাগজে ভালো শোনালেও মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন। অতীতে কারিগরিভাবে ভালো ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগও দুর্বল প্রয়োগব্যবস্থা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।
ব্যাংক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দুর্বল ও একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করে কোন প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার মতো অবস্থায় আছে আর কোনটি নেই, তা নির্ধারণ করতে হবে। যেসব ব্যাংককে অকার্যকর বা টেকসই নয় বলে চিহ্নিত করা হবে, সেগুলোর জন্য পৃথক রেজল্যুশন পরিকল্পনাও তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ কমাতে পুরো ব্যাংক খাতের জন্য একটি সমন্বিত কৌশল নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি তফসিলি ব্যাংককে নিজস্ব খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি স্বচ্ছ পরিচালনা কাঠামো এবং ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে ক্ষতির দায় ভাগাভাগির নীতির ভিত্তিতে একটি ‘রেস্ট্রাকচারিং অ্যান্ড রেজল্যুশন ফান্ড’ গঠন করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কারণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিল অনুমোদনের কারণে ২০১৭ সালে একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী একসঙ্গে সাতটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিল। নিয়ন্ত্রক ছাড় বা অতিরিক্ত সহনশীলতার কারণে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ বেড়েছে, বাজারের শৃঙ্খলা দুর্বল হয়েছে এবং ব্যাংকের সম্পদের প্রকৃত মানও অনেক ক্ষেত্রে আড়াল হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের ওই নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। একই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের হার আরও বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
জাহিদ হোসেনের মতে, ব্যাংক পুনর্গঠন কার্যকর করতে হলে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্ট’ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা স্পষ্ট করতে হবে। কোনো ব্যাংকের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত, কোন ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, কোনটিকে পুনর্গঠন করতে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আর টেকসই নয়—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া থাকতে হবে।
তিনি ব্যাংক সংস্কারের বিষয়টিকে অস্ত্রোপচারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, অসুস্থ ব্যাংককে কেবল অতিরিক্ত তারল্য সহায়তা দিয়ে বা নিয়ন্ত্রক ছাড় দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে আগে প্রতিটি ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় করতে হবে। এরপর ব্যাংকটি কতটা কার্যকরভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তার ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় বাধা শুধু কারিগরি নয়, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতি। জাহিদ হোসেনের মতে, প্রভাবশালী ব্যাংক মালিক, বড় ঋণগ্রহীতা কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী যদি আইন প্রয়োগে বাধা দেয়, তাহলে শুধু বিশেষজ্ঞদের তৈরি সংস্কার পরিকল্পনা দিয়ে ব্যাংক খাতের সংকট সমাধান করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের অবনতির জন্য যারা দায়ী এবং ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদেরই প্রথমে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে। এর পরও যদি সরকারি অর্থ ব্যবহার করতে হয়, তখন তা করা যেতে পারে। অন্যথায় আগের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের করের টাকা দিয়ে মেটাতে হবে।

