সংযুক্ত আরব আমিরাতে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কার্যক্রম যখন বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই বড় অঙ্কের মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকটিকে সংকট থেকে টেনে তুলল সরকার। আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত মূলধন সংরক্ষণের শর্ত পূরণ করতে না পারায় সেখানকার চারটি শাখা গুটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ এসেছিল আগেই। এই পরিস্থিতি এড়াতে অর্থ মন্ত্রণালয় জনতা ব্যাংককে প্রায় ৮১ লাখ ৭ হাজার ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় এক হাজার তিন কোটি টাকা, পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছে।
আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী সেখানে কার্যরত প্রতিটি বিদেশি ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই সীমা ৪০ কোটি দিরহাম নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে সংরক্ষিত ছিল মাত্র ১০ কোটি দিরহাম। ফলে ৩০ কোটি দিরহামের বড় একটি ঘাটতি তৈরি হয়, যা টাকার হিসাবে হাজার কোটির বেশি। এই ঘাটতির কারণে চলতি বছরেই একাধিকবার সতর্কীকরণ নোটিশ পাঠায় আমিরাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সবশেষ নোটিশে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে একজন প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়। একই সঙ্গে নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলা এবং নতুন কোনো সেবা প্রদানও পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বলা হয়, পাশাপাশি ব্যাংকের হিসাব থেকে অর্থ তোলার ক্ষেত্রেও নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে জনতা ব্যাংককে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ পাঠানোর নির্দেশ দেয়। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন সংরক্ষিত তহবিল থেকে এই অর্থ স্থানীয় শাখার মাধ্যমে পাঠানোর অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আমিরাতে থাকা জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা—আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল আইন—আপাতত স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে আমিরাতে কার্যক্রম চালিয়ে আসা জনতা ব্যাংকের এই শাখাগুলোর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির নিত্যদিনের লেনদেন জড়িত। প্রবাসী আয় দেশে পাঠানো ছাড়াও সঞ্চয়ী, চলতি ও মেয়াদি হিসাব পরিচালনা করেন তারা এসব শাখার মাধ্যমে। এ ছাড়া ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও মার্কিন ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগও রয়েছে এখানে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যবহৃত ঋণপত্র খোলা, বাণিজ্যিক গ্যারান্টি প্রদান এবং বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধাও দিয়ে থাকে এই শাখাগুলো। ফলে শাখা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু ব্যাংকের সুনামই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হতেন হাজারো প্রবাসী শ্রমিক ও ব্যবসায়ী, যারা প্রতিনিয়ত এসব সেবার ওপর নির্ভরশীল।
সাময়িকভাবে সংকট কাটলেও দীর্ঘমেয়াদে আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত মূলধন কাঠামো বজায় রাখা জনতা ব্যাংকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘাটতি যেন আর তৈরি না হয়, সে জন্য নিয়মিত মূলধন পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো সংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর বিদেশি কার্যক্রম পরিচালনায় আরও কঠোর তদারকির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে।

