দেশের অর্থব্যবস্থায় প্রচলিত কাগজি নোটের প্রায় অর্ধেকই এক হাজার ও পাঁচশ টাকা মূল্যমানের—এই দুই ধরনের নোট মিলিয়ে মোট প্রচলিত নোটের প্রায় ঊনপঞ্চাশ শতাংশ দখল করে রেখেছে। অন্যদিকে বাজারে সবচেয়ে কম সংখ্যায় দেখা যায় দুইশ টাকা মূল্যমানের নোট। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুন মাসের শেষে দেশে ব্যাংক ও সাধারণ মানুষের হাতে বিভিন্ন মূল্যমানের মিলিয়ে মোট নয়শ ছেষট্টি কোটির বেশি কাগজি নোট প্রচলনে ছিল, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় তিন লাখ আটষট্টি হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় অর্ধেকই এক হাজার ও পাঁচশ টাকার নোট।
সংখ্যার বিচারে বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত নোট পাঁচশ টাকার, যার পরিমাণ প্রায় দুইশ সত্তর কোটি, এবং এসব নোটের সম্মিলিত আর্থিক মূল্য এক লাখ চৌত্রিশ হাজার কোটি টাকার বেশি। আর্থিক মূল্যের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অবদান এক হাজার টাকার নোটের, যার সংখ্যা প্রায় দুইশ চার কোটি এবং সম্মিলিত মূল্য প্রায় দুই লাখ চার হাজার কোটি টাকা।
বিপরীতে, প্রচলনে সবচেয়ে কম দেখা যায় দুইশ টাকার নোট—মাত্র প্রায় তিপ্পান্ন কোটি, যার মোট আর্থিক মূল্য সাড়ে দশ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এর তুলনায় একশ টাকার নোটের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ, সাড়ে সাতশ কোটির বেশি, যার মূল্যমান প্রায় সাড়ে এগারো হাজার কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজারে বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের পরিমাণে এই তারতম্যের পেছনে মূল কারণ জনসাধারণের দৈনন্দিন লেনদেনের ধরন, নোটের হাতবদলের গতি, স্থায়িত্ব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপার পরিকল্পনা। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব জরিপ ও হিসাবের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় কোন মূল্যমানের নোট কত সংখ্যায় ছাপানো প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, পাঁচশ ও এক হাজার টাকার মতো বড় মূল্যমানের নোটের প্রচলন বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ দেশের চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি। পণ্যের দাম বাড়ায় দৈনন্দিন কেনাকাটায় বড় নোটের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে—যেমন এক কেজির বেশি ওজনের ব্রয়লার মুরগি কিনতেই এখন দুইশ টাকার বেশি খরচ হয়। এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথে সাধারণত কেবল পাঁচশ ও এক হাজার টাকার নোট সরবরাহ করা হয়, এবং বড় অঙ্কের লেনদেন বা নগদ উত্তোলনেও এই দুই নোটের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এক টাকা, দুই টাকা ও পাঁচ টাকার কাগজি নোট বাজারে এখন প্রায় দেখাই যায় না, এবং এসব মূল্যমানের ধাতব মুদ্রাও মানুষ সহজে সঙ্গে রাখতে চান না বলে এসব লেনদেনের বাইরে চলে গেছে। ফলে বাস্তবে প্রথম কার্যকর কাগজি নোট বলা যায় দশ টাকাকে, যা রিকশাভাড়া, চা-নাশতা কিংবা বাসভাড়ার মতো ক্ষুদ্র লেনদেনে সবচেয়ে বেশি হাতবদল হয়।
দৈনন্দিন ছোট লেনদেনে বিশ ও পঞ্চাশ টাকার নোটও যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহৃত হয়, যদিও আর্থিক মূল্যের হিসাবে এদের অবদান তুলনামূলক কম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বাজারে চালু থাকা মোট নোটের মধ্যে প্রায় তিনশ তেইশ কোটি নোট দশ, বিশ ও পঞ্চাশ টাকার, যেগুলোর সম্মিলিত আর্থিক মূল্য মাত্র সাত হাজার তিনশ কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে দশ টাকার নোটের সংখ্যা প্রায় একশ পঞ্চাশ কোটি, বিশ টাকার প্রায় চুরানব্বই কোটি এবং পঞ্চাশ টাকার নোটের সংখ্যা ঊনআশি কোটির বেশি।
বাজারে থাকা নোটের একটি বড় অংশ বেশ পুরোনো, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে পুরোনো নোট প্রত্যাহার করে নতুন নোট বাজারে ছাড়তে পারেনি বলে জানা গেছে। এ কারণে ছেঁড়া-ফাটা ও জীর্ণ নোট নিয়ে সাধারণ মানুষকে লেনদেনে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, বড় নোটের তুলনায় ছোট মূল্যমানের নোট এখন সংখ্যায় কম, এবং কাগজের সংকটের কারণে বিশ ও একশ টাকার নোট চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো ছাপানো সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি দশ টাকার নোট অত্যধিক হাতবদলের কারণে দ্রুত ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে পড়ে, যার বিপরীতে নতুন নোট বাজারে আসতে কিছু সময় লেগে যায়—এই দুই কারণেই ছোট নোটের প্রচলন তুলনামূলক কম বলে তিনি জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আরও জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর কাঁচামালের দাম, পরিবহন খরচ এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নোট ছাপানোর খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে মুখপাত্র জানান, নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি জাতীয় কিউআর কোড ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে, যা ব্যাপকভাবে গ্রহণ করা হলে নোট ছাপানোর খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছেমতো নতুন নোট ছাপিয়ে বাজারে ছাড়তে পারে না। প্রচলিত আইনি বিধান অনুযায়ী, বাজারে যত মূল্যের নোট ছাড়া হবে, তার সমপরিমাণ মূল্যের ভৌত ও আর্থিক সম্পদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জামানত হিসেবে সংরক্ষিত থাকতে হয়। ফলে বর্তমানে প্রচলিত প্রায় তিন লাখ আটষট্টি হাজার কোটি টাকা মূল্যের নোটের বিপরীতে সমপরিমাণ মূল্যের সম্পদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রয়েছে, যা সোনা, রুপা, বৈদেশিক মুদ্রা, সরকারি সিকিউরিটিজ ও ধাতব মুদ্রার আকারে সংরক্ষিত।
এই জামানতের সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় একাশি শতাংশ, বৈদেশিক মুদ্রা—যার পরিমাণ প্রায় দুই লাখ সাতানব্বই হাজার কোটি টাকা। দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ সরকারের ইস্যু করা ট্রেজারি বিল ও বন্ড, যার পরিমাণ প্রায় ছেচল্লিশ হাজার কোটি টাকা—এসব সিকিউরিটিজ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে দেওয়া ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করে।
সোনা-রুপার মতো ঐতিহ্যবাহী জামানত ব্যবস্থাও অব্যাহত রয়েছে—নোটের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রায় একুশ হাজার সাতশ কোটি টাকা মূল্যের সোনা এবং সামান্য পরিমাণ রুপা সংরক্ষিত আছে, যা মোট জামানতের প্রায় ছয় শতাংশ। এর বাইরে ব্যাংকগুলোকে দেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ-অগ্রিম এবং প্রচলিত ধাতব মুদ্রাও জামানত সম্পদের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মুদ্রা প্রচলনের এই কাঠামো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি বাস্তব প্রতিফলন—মূল্যস্ফীতির চাপে বড় নোটের চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি ছোট নোটের সরবরাহ-সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে বাস্তবিক অসুবিধা তৈরি করছে। এই দ্বিমুখী চাপ মোকাবিলায় নোট ছাপানোর দক্ষতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার—দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

