একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং খাতের চেনা চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় ব্যাংকের শাখায় হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, ঋণের কাগজপত্র যাচাই, গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর কিংবা লেনদেনের হিসাব মেলানোর মতো প্রায় প্রতিটি কাজেই মানুষের সরাসরি উপস্থিতি অপরিহার্য ছিল।
ফাইল-পত্র, দীর্ঘ সারি, ক্যাশ কাউন্টার এবং ব্যাংক কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল সেই ব্যবস্থা এখন ক্রমেই জায়গা করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক প্রসেস অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং জেনারেটিভ এআই-নির্ভর প্রযুক্তিকে।
প্রশ্ন উঠেছে—এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব কি শেষ পর্যন্ত ব্যাংকারদের চাকরি কেড়ে নেবে? এর উত্তর সরল ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ নয়। বাস্তবতা হলো, এআই এখনো পুরো ব্যাংকারকে প্রতিস্থাপন করছে না; বরং একজন ব্যাংকারের চাকরির ভেতরের নির্দিষ্ট কিছু কাজকে স্বয়ংক্রিয় করে দিচ্ছে। এর ফলে কিছু প্রচলিত পদ সংকুচিত হচ্ছে, নতুন কর্মী নিয়োগের ধরন বদলাচ্ছে এবং একই সঙ্গে এমন কিছু পেশার জন্ম হচ্ছে, যেগুলোর অস্তিত্ব এক দশক আগেও ব্যাংকিং খাতে ছিল সীমিত বা অনুপস্থিত।
বিশ্বব্যাপী এই পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থানের ধরনও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের প্রভাবের আওতায় রয়েছে। উন্নত অর্থনীতিতে এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাব আরও বেশি—প্রায় ৬০ শতাংশ চাকরি এ প্রযুক্তির কারণে পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। উদীয়মান বাজারে এই হার প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। আইএমএফ প্রথম ২০২৪ সালের শুরুতে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে এআইয়ের এই ব্যাপক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের গবেষণা ও বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকেও আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এআইয়ের কারণে বিশ্ব শ্রমবাজারে দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়টি পুনরায় তুলে ধরেছেন।
তবে এআইয়ের প্রভাবকে শুধু চাকরি হারানোর হিসাব দিয়ে বিচার করলে প্রকৃত চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর প্রভাব মূলত চাকরির ধরন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পাচ্ছে। কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের প্রয়োজন কমছে, আবার নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কাজের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা হবে শুধু চাকরির জন্য নয়, বরং পরিবর্তিত চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব তরুণ ও কর্মজীবনে নতুন প্রবেশকারীদের ওপর বিশেষভাবে পড়তে পারে। আইএমএফের ২০২৬ সালের গবেষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, এআই-সম্পর্কিত বা উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার ক্ষেত্রে নতুন প্রবেশকারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর হচ্ছে। এর একটি কারণ হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে এআই-নির্ভর কাজের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কর্মী তৈরির বদলে অভিজ্ঞ কর্মীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়িয়ে নেওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণদের জন্য প্রচলিত কিছু এন্ট্রি-লেভেল কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’-ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের এই পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের কাঠামো পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয়তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে আগামী কয়েক বছরে অনেক প্রচলিত কাজের চাহিদা কমবে, একই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত বা পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে একই সময়ে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ, বিদ্যমান চাকরি হারানোর তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে নিট হিসাবে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ অতিরিক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, এআইকে শুধু চাকরি ধ্বংসের প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি শ্রমবাজারকে নতুনভাবে সাজানোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যে কাজগুলো সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায়, সেগুলোর চাহিদা কমতে পারে; বিপরীতে ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, সৃজনশীলতা, জটিল সমস্যা সমাধান ও মানবিক যোগাযোগনির্ভর কাজের গুরুত্ব বাড়তে পারে।
তাই আগামী দিনের কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। কর্মীদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন, বিদ্যমান দক্ষতাকে আধুনিক করা এবং প্রয়োজনে সম্পূর্ণ নতুন দক্ষতা শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিশ্ব শ্রমবাজারের সামনে এখন মূল প্রশ্নটি তাই শুধু কতগুলো চাকরি হারাবে, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—হারিয়ে যাওয়া চাকরির জায়গায় কী ধরনের কাজ তৈরি হবে এবং সেই কাজের জন্য মানুষকে কতটা প্রস্তুত করা যাচ্ছে। এআইয়ের যুগে যে দেশ ও প্রতিষ্ঠান দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের ওপর যত বেশি গুরুত্ব দেবে, পরিবর্তিত কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানোর সক্ষমতাও তাদের তত বেশি হবে।
আধুনিক ব্যাংকিংয়ে এআইকে কেবল একটি সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গ্রাহকসেবা থেকে শুরু করে ব্যাক-অফিসের হিসাব, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ঋণ মূল্যায়ন—প্রায় প্রতিটি স্তরেই এর ব্যবহার বাড়ছে।
গ্রাহকসেবায় এআই চ্যাটবট ও ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট এখন ২৪ ঘণ্টা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। হিসাবের তথ্য, লেনদেন, কার্ড, ব্যাংকিং সেবা বা অন্যান্য সাধারণ বিষয়ে গ্রাহককে প্রতিবার মানব কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে না। ফলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ছে এবং ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ঋণ মূল্যায়নেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে একজন ক্রেডিট কর্মকর্তাকে গ্রাহকের আবেদন, আয়, সম্পদ, পূর্ববর্তী ঋণ ও বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। এখন ডেটা-নির্ভর ব্যবস্থা খুব দ্রুত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণঝুঁকি মূল্যায়নে কর্মকর্তাকে সহায়তা করতে পারে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আচরণসহ সব ধরনের তথ্য ব্যবহার সব ব্যাংকে বা সব দেশে একইভাবে অনুমোদিত নয়; ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা ও নৈতিকতার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
জালিয়াতি শনাক্তকরণেও এআইয়ের সক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোটি কোটি লেনদেনের মধ্য থেকে অস্বাভাবিক লেনদেনের ধরন, সন্দেহজনক প্যাটার্ন বা সম্ভাব্য প্রতারণা দ্রুত শনাক্ত করা মানুষের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। মেশিন লার্নিংভিত্তিক ব্যবস্থা সেই কাজ অনেক দ্রুত করতে পারে।
ব্যাংকের ব্যাক-অফিসেও পরিবর্তন স্পষ্ট। নথি স্ক্যান, তথ্য সংগ্রহ, ডেটা এন্ট্রি, হিসাব মিলিয়ে দেখা, নিয়মিত রিপোর্ট তৈরি এবং কিছু কমপ্লায়েন্স কার্যক্রম রোবোটিক প্রসেস অটোমেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। একজন কর্মকর্তা যেখানে শত শত নথি পড়ে তথ্য আলাদা করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে পারেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটেই সেই কাজের প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করতে পারে।
ফলে এআই ব্যাংকের উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে। কিন্তু এর অপর পিঠ হলো—যে কাজগুলো এতদিন মানুষের কর্মসংস্থানের ভিত্তি ছিল, সেগুলোর কিছু অংশের জন্য এখন আগের মতো জনবল প্রয়োজন হচ্ছে না।
কোন ব্যাংকাররা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে? ব্যাংকের সব কর্মী সমানভাবে ঝুঁকিতে নন। যে কাজগুলো নিয়মভিত্তিক, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং সহজে ডেটায় রূপান্তর করা যায়, সেগুলো অটোমেশনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ হিসাব যাচাই, লেনদেন মিলিয়ে দেখা, প্রাথমিক নথি যাচাই, নিয়মিত রিপোর্ট তৈরি, সাধারণ গ্রাহক জিজ্ঞাসার উত্তর, প্রাথমিক ঋণ আবেদন বাছাই এবং কিছু ব্যাক-অফিস কার্যক্রম এই তালিকায় পড়ে।
বিশ্বের ব্যাংকিং খাতেও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মরগ্যান স্ট্যানলির একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইউরোপের ব্যাংকিং খাতে ২০৩০ সালের মধ্যে দুই লাখের বেশি চাকরি এআই ও ডিজিটালাইজেশনের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা ওই অঞ্চলের ব্যাংকিং কর্মশক্তির প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। ব্যাক-অফিস, কমপ্লায়েন্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কিছু কাজ বিশেষভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ‘ঝুঁকিতে’ থাকা মানেই ‘চাকরি হারানো নিশ্চিত’ নয়। কোনো ব্যাংক একই কাজ কম কর্মী দিয়ে সম্পন্ন করতে পারে; আবার অন্য কোনো ব্যাংক অটোমেশনের ফলে সাশ্রয় হওয়া সময় ও অর্থ ব্যবহার করে নতুন সেবা সম্প্রসারণ করতে পারে। ফলে এআইয়ের প্রভাব নির্ভর করবে ব্যাংকের ব্যবসায়িক কৌশল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণের ওপর।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে নতুন নিয়োগে। এআইয়ের কারণে ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়তো তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুতি নয়; বরং নতুন কর্মী নিয়োগের ধরন বদলে যাওয়া।
একজন জুনিয়র ব্যাংকার সাধারণত তথ্য সংগ্রহ, রিপোর্ট তৈরি, নথি পর্যালোচনা ও প্রাথমিক বিশ্লেষণের মতো কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এসব কাজের একটি বড় অংশ যদি এআই দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে নতুন কর্মীদের দিয়ে আগের মতো দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিক কাজ করানোর প্রয়োজন কমে যাবে।
ফলে ব্যাংকিং পেশায় প্রবেশের ঐতিহ্যগত ‘সিঁড়ির নিচের ধাপ’ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি ইউবিএস ২০২৭ সাল থেকে জুনিয়র ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার নিয়োগে এআই ব্যবহারের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। কারণ আর্থিক বিশ্লেষণ, গবেষণা ও উপস্থাপনার মতো কিছু কাজ, যা একসময় জুনিয়র কর্মীদের দায়িত্বের বড় অংশ ছিল, এখন এআইয়ের সাহায্যে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের মতো তরুণ কর্মশক্তিনির্ভর দেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষিত তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। কিন্তু এআই যদি রুটিন কাজের চাহিদা কমিয়ে দেয়, তাহলে শুধু বর্তমান কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তাই নয়, নতুন গ্র্যাজুয়েটদের ব্যাংকিং খাতে প্রবেশের সুযোগও প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে কতটা প্রভাব পড়বে? উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে এআইয়ের ব্যবহার এখনো প্রাথমিক থেকে মধ্যবর্তী পর্যায়ে রয়েছে। অনেক ব্যাংকের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, পুরোনো কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা, তথ্যের মান, সাইবার নিরাপত্তা এবং আন্তঃব্যাংক প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় পার্থক্য রয়েছে। ফলে আগামীকাল থেকেই বিপুলসংখ্যক ব্যাংকারকে রোবট দিয়ে প্রতিস্থাপন করার বাস্তবতা নেই।
কিন্তু পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল ব্যাংকিং, ই-কেওয়াইসি, মোবাইল আর্থিক সেবা, স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থা, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং চ্যাটবটের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা ও অটোমেশনের দিকে এগিয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবা খাতেও বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যাপকভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর।
ই-কেওয়াইসি চালুর ফলে গ্রাহককে অনেক ক্ষেত্রে শাখায় গিয়ে দীর্ঘ ফরম পূরণ করতে হচ্ছে না। ডিজিটাল পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘরে বসে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াও সহজ হয়েছে। একইভাবে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য চ্যাটবট ও ভার্চুয়াল সহকারী ব্যবহার করছে। সিটি ব্যাংকের ‘আঙ্কুর’ কিংবা ইস্টার্ন ব্যাংকের ‘জিয়া’—এ ধরনের ডিজিটাল সহকারীর ব্যবহার ব্যাংকিং সেবার পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকও এআই ব্যবহারের জন্য নীতিগত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করছে। ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এআই নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয়। এর পাশাপাশি ডিজিটাল আর্থিক সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা এবং আধুনিক পেমেন্ট অবকাঠামোর উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অতএব বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এআইয়ের প্রবেশকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রযুক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ডিজিটালাইজেশনের বৃহত্তর ধারার মধ্যেই এআই আরও গুরুত্বপূর্ণ স্তর হিসেবে যুক্ত হচ্ছে।
রোবট কি ব্যাংকারের জায়গায় নতুন ব্যাংকার তৈরি করবে? এখানেই রয়েছে আশার দিক। প্রযুক্তি কিছু কাজ কমিয়ে দিলেও নতুন কাজের চাহিদা তৈরি করছে। ডেটা সায়েন্টিস্ট, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, এআই মডেল ভ্যালিডেটর ও অডিটর, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, ফ্রড অ্যানালিস্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞ, এআই গভর্ন্যান্স কর্মকর্তা, মডেল-ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এবং ফিনটেক পেশাজীবীদের গুরুত্ব বাড়ছে।
অর্থাৎ ডেটা এন্ট্রি ক্লার্ক ও ব্যাংকিং অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো প্রচলিত কিছু পদ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পদ তৈরি হচ্ছে। সাধারণ কাস্টমার কেয়ার কর্মীর জায়গায় এআই-সমর্থিত সেবা ব্যবস্থাপনা, জুনিয়র ক্রেডিট বিশ্লেষণের জায়গায় উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ এবং ম্যানুয়াল কমপ্লায়েন্সের পাশাপাশি এআই-সহায়ক ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন বাড়ছে।
ব্যাংক অব এশিয়ার ২০২৬ সালের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও এআই-ভিত্তিক টুল ব্যবহারের সক্ষমতাকে উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে ভবিষ্যতের ব্যাংকারের পরিচয় শুধু ব্যাংকিং জ্ঞান দিয়ে নির্ধারিত হবে না; প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর সক্ষমতাও তার পেশাগত যোগ্যতার অংশ হবে।
তবে ব্যাংকিং কেবল সংখ্যা, হিসাব ও অ্যালগরিদমের সমষ্টি নয়। এটি মূলত আস্থার ব্যবসা। একজন গ্রাহক যখন ব্যবসায়িক সংকটে পড়েন, বড় ঋণের প্রয়োজন হয় কিংবা কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন মানবিক বিচার ও পারস্পরিক আস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এআই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু একটি ছোট ব্যবসায়ীর বাস্তব পরিস্থিতি, ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, পারিবারিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং সংকটের মানবিক দিক সবসময় সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। একইভাবে বড় করপোরেট মার্জার, অধিগ্রহণ, নতুন আর্থিক পণ্য চালু কিংবা জটিল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে কেবল গাণিতিক বিশ্লেষণ যথেষ্ট নয়।
নৈতিকতা ও বিচারবুদ্ধির ক্ষেত্রেও মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এআই যে তথ্য ও মডেলের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত দেয়, তাতে ভুল বা পক্ষপাত থাকলে ফলও ভুল হতে পারে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো অ্যালগরিদম যদি পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য ব্যবহার করে, তাহলে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের ব্যাংকিং সম্ভবত ‘মানুষ বনাম এআই’ নয়; বরং ‘মানুষ ও এআইয়ের সমন্বিত’ মডেল হবে।
এআইয়ের সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। ভুল তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত মডেল ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারে। ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের অপব্যবহার গ্রাহকের গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পক্ষপাতদুষ্ট অ্যালগরিদম ঋণপ্রাপ্তিতে বৈষম্য তৈরি করতে পারে। আবার অপরাধীরাও এআই ব্যবহার করে আরও পরিশীলিত জালিয়াতি ও সাইবার আক্রমণ চালাতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের আর্থিক খাতের একটি অংশ এখনো পুরোনো কোর ব্যাংকিং অবকাঠামো এবং নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তির মধ্যে সমন্বয়ের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এআই যুক্ত করার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু এআই চালু করলেই হবে না; কোন সিদ্ধান্ত মেশিন নেবে, কোন সিদ্ধান্তে মানুষের অনুমোদন প্রয়োজন, গ্রাহকের তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হবে, ভুল সিদ্ধান্তের দায় কার এবং অ্যালগরিদম কীভাবে পরীক্ষা ও নিরীক্ষা করা হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।
এআইয়ের যুগে ব্যাংকারদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের দক্ষতা পুনর্গঠন করা। শুধু ফাইল সই করা, লেজার মেলানো কিংবা নিয়মিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজে সীমাবদ্ধ থাকা ভবিষ্যতে নিরাপদ ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা দেবে না।
ব্যাংকারদের প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। কোডিং বিশেষজ্ঞ হওয়া সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়; কিন্তু এআই কীভাবে কাজ করে, এর সীমাবদ্ধতা কী এবং কীভাবে এআই-ভিত্তিক সরঞ্জাম সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয়—তা জানা প্রয়োজন। ডেটা অ্যানালিটিকসও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিপুল তথ্য থেকে ব্যবসার সম্ভাবনা, গ্রাহকের আচরণ, ঋণঝুঁকি ও বাজারের প্রবণতা বুঝতে পারার দক্ষতা ভবিষ্যতের ব্যাংকারকে আলাদা করবে।
একই সঙ্গে গ্রাহক সম্পর্ক, যোগাযোগ, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচার এবং জটিল সমস্যা সমাধানের দক্ষতার গুরুত্ব বাড়বে। কারণ সাধারণ কাজ যখন প্রযুক্তি করবে, তখন মানুষকে অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের কাজ করতে হবে।
‘রোবট মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে’—এই বক্তব্য পুরোপুরি ভুল নয়, কিন্তু এটি অসম্পূর্ণ। প্রযুক্তির ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন পুরোনো কাজের ধরন বিলুপ্ত করেছে, আবার নতুন কাজও সৃষ্টি করেছে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন, শিল্পযন্ত্র কিংবা কম্পিউটারের আবির্ভাবেও কর্মসংস্থান ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কাজের প্রকৃতি বদলেছে, দক্ষতার চাহিদা পরিবর্তিত হয়েছে এবং নতুন পেশার জন্ম হয়েছে।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পার্থক্য হলো, আগের প্রযুক্তিগুলো মূলত শারীরিক শ্রম বা নির্দিষ্ট নিয়মের কাজকে স্বয়ংক্রিয় করেছিল; এআই এখন তথ্য বিশ্লেষণ, ভাষা, পূর্বাভাস ও কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক কাজেও প্রবেশ করছে। ফলে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—চাকরি রক্ষার নামে প্রযুক্তিকে আটকে রাখা কোনো সমাধান নয়। আবার খরচ কমানোর যুক্তিতে কর্মীদের ব্যাপকভাবে বাদ দেওয়াও দায়িত্বশীল ব্যাংকিং নয়। ব্যাংকগুলোকে কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দিতে হবে, নতুন দায়িত্বে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করতে হবে এবং প্রযুক্তির সুফল কর্মী ও গ্রাহক—উভয়ের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখনই প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতের একটি সুসংগঠিত এআই ও কর্মশক্তি রূপান্তর পরিকল্পনা। কোন কাজ অটোমেশনের ঝুঁকিতে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়বে, কীভাবে ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কীভাবে ভবিষ্যতের ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—এসব বিষয়ে এখনই পরিকল্পনা করা দরকার। কারণ প্রযুক্তিকে থামিয়ে চাকরি রক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রযুক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করা অবশ্যই সম্ভব, যাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ে, ব্যাংকিং সেবা সহজ হয় এবং মানুষও নতুন ও অধিক মূল্যবান কাজে যুক্ত হতে পারে।
সুতরাং রোবট ব্যাংকারের চাকরি পুরোপুরি কেড়ে নিচ্ছে—এ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। বরং রোবট ও এআই ব্যাংকারের কাজের পুরোনো সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে। যে কাজ দ্রুত, নিয়মভিত্তিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক, তা মেশিনের হাতে যাচ্ছে; আর বিচারবুদ্ধি, সম্পর্ক, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও নৈতিকতার প্রয়োজন যেখানে বেশি, সেখানে মানুষের গুরুত্ব টিকে থাকছে।
আগামী দিনের ব্যাংকিং হবে মূলত ‘হিউম্যান প্লাস এআই’ মডেলের। মেশিন সামলাবে বিপুল ডেটা, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ, দ্রুত বিশ্লেষণ ও প্রাথমিক সেবা; মানুষ দেখবে জটিল সিদ্ধান্ত, গ্রাহকসম্পর্ক, নৈতিকতা ও জবাবদিহি। এই রূপান্তরে জয়ী হবে সেই ব্যাংকার, যিনি এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—‘রোবট কি ব্যাংকারদের চাকরি কেড়ে নেবে?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—এআইয়ের যুগে ব্যাংকারের কাজ কীভাবে বদলাবে এবং সেই নতুন বাস্তবতার জন্য বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও তার কর্মীরা কতটা প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এআই হবে কর্মসংস্থানের হুমকি, নাকি অধিক দক্ষ ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার নতুন ভিত্তি ।

