দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি রয়েছে মাত্র ১০টি ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতের আর্থিক সংকট সব ব্যাংকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি; বরং কয়েকটি ইসলামী ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই এর বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০টি সংকটাপন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।
এই ১০ ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। পরে এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ নিজেদের ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিতরণ করে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা ব্যাংকিং নীতিমালা ও বিধিবিধানের লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৪৯ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আরও ৬ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা বেড়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন বলেন, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় অংশই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব ঋণ আদায়ের অগ্রগতি এখনো খুবই সীমিত।
তিনি বলেন, অন্যান্য ঋণগ্রহীতার কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে। নগদ অর্থ পরিশোধ ও ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। কোনো বিকল্প না থাকলে শেষ পর্যন্ত ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে।
চলতি বছর ইসলামী ব্যাংক পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ৫ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করেছে। পাশাপাশি শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে ৭৪৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে বলে জানান তিনি।
খেলাপি ঋণে দ্বিতীয় জনতা ব্যাংক
খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ।
জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় অংশই কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে আটকে আছে। শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ আটকে রয়েছে।
এসব খেলাপির মধ্যে বেক্সিমকো, এস আলম ও এননটেক্স রয়েছে। শুধু বেক্সিমকো গ্রুপের কাছেই জনতা ব্যাংকের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও থার্মেক্স গ্রুপও ব্যাংকটির বড় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকও বিপুল খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশই এখন খেলাপি।
ব্যাংকটির কার্যক্রমে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের বড় ধরনের প্রভাব ছিল। ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্বল পরিচালনব্যবস্থার কারণে ব্যাংকটি বর্তমানে আরও চারটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
এস আলম-সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতেও বিপুল খেলাপি ঋণ
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৯৭ শতাংশ।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৭৮ শতাংশ। ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ৯৬ শতাংশ।
এই দুই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও এস আলম গ্রুপের বড় ধরনের প্রভাব ছিল।
অন্যদিকে এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৫৬ দশমিক ০৪ শতাংশ। ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বা বিতরণ করা ঋণের ৬৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ব্যাংকটির ওপর বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বড় ধরনের প্রভাব ছিল।
মূল সমস্যা ঋণের কেন্দ্রীভবন
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, দেশের খেলাপি ঋণের চিত্র থেকে স্পষ্ট যে কয়েকটি ইসলামী ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই সংকট সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রধান কারণ হলো অল্পসংখ্যক বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতার কাছে বিপুল পরিমাণ ঋণ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাওয়া। এই অতিরিক্ত ঋণকেন্দ্রিকতা থেকে ব্যাংক খাতকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি হয়েছে। আর বাকি প্রায় ২০ শতাংশীয় পয়েন্টের পেছনে রয়েছে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতি।

