বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মক্ষেত্রের সহায়ক সুবিধাগুলো পিছিয়ে গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীর সংখ্যা ৯১০ জন বাড়লেও শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, অফিস সময়ের পর যাতায়াত সুবিধা এবং লিঙ্গসমতা বিষয়ে সচেতনতা প্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় অবনতি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লিঙ্গসমতা প্রতিবেদন’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন সময়ে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৩৫ হাজার ৯৭১ জন হয়েছে। তবে নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিভিন্ন সুবিধা আগের ছয় মাসের তুলনায় উন্নত হয়নি, বরং কয়েকটি ক্ষেত্রে কমেছে।
জানুয়ারি-জুন সময়ে শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা ৩৮ থেকে কমে ৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে। অফিস সময়ের পর নারী কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিবহন সুবিধাও কমেছে। ৬১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন সুবিধা দেওয়া ব্যাংকের সংখ্যা ৩৮ থেকে কমে ৩৬টিতে নেমেছে।
লিঙ্গসমতা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির প্রশিক্ষণ আয়োজনকারী ব্যাংকের সংখ্যাও ৫৩ থেকে কমে ৪৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুবিধা থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছয় থেকে কমে চারটিতে দাঁড়িয়েছে। অফিস সময়ের পর নারী কর্মীদের পরিবহন সুবিধা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ২৪ থেকে কমে ২৩টিতে এবং লিঙ্গসমতা বিষয়ে সচেতনতা প্রশিক্ষণ আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান ২৩ থেকে কমে ২১টিতে নেমেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানিত ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, নারী কর্মসংস্থান বাড়ার বিষয়টি অবশ্যই উৎসাহজনক। তবে কর্মক্ষেত্রে সহায়ক সুবিধা কমে যাওয়া থেকে বোঝা যায়, অগ্রগতিটি এখনো মূলত সংখ্যাগত, প্রাতিষ্ঠানিক নয়।
তিনি বলেন, নারীদের নিয়োগ, কর্মক্ষেত্রে ধরে রাখা এবং ক্যারিয়ারে উন্নতির জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, অফিস সময়ের পর নিরাপদ যাতায়াত এবং লিঙ্গসমতা বিষয়ে সচেতনতা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বিশেষ করে উচ্চ ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীদের এগিয়ে নিতে এসব সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ।
এসব সুবিধার অবনতি হলে নারী কর্মীদের ওপর কাজ ও পরিবারের দায়িত্বের চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, ব্যাংকগুলোর এসব সুবিধাকে ঐচ্ছিক সুবিধা হিসেবে না দেখে মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকেরও এসব বিষয়ে পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিয়মিতভাবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে টেকসই লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করতে শুধু বেশি নারী নিয়োগ করলেই হবে না। নারীরা যাতে নিরাপদ, সহায়ক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে কাজ করতে পারেন এবং ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে পারেন, সেই সুযোগও তৈরি করতে হবে।
তবে ব্যাংক খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এখনো চালু রয়েছে। ৬১টি ব্যাংকে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সচেতনতা নীতি রয়েছে এবং এসব ব্যাংকে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, গত এক বছরে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর অনুপাত প্রায় স্থির রয়েছে—প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংক খাতের মোট কর্মীসংখ্যা ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২ লাখ ১৭ হাজার ৮১৮ জন হয়েছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোতে মোট কর্মীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারী। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে নারী কর্মীর অনুপাত ১৭ শতাংশ। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট কর্মীর ১৬ শতাংশের কিছু বেশি নারী।
নারী কর্মীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার উচ্চ পর্যায়ে আরও বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। প্রবেশ পর্যায়ে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ প্রায় ১৭ শতাংশ এবং মধ্যম পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের পদে তাদের অংশগ্রহণ নেমে এসেছে মাত্র ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশে।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও নারীদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কম। মোট পরিচালনা পর্ষদ সদস্যের ১৩ শতাংশের কিছু বেশি নারী। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নারী সদস্যের হার ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে তা মাত্র ৪ শতাংশ।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান খাইরুন নাহার হক বলেন, কর্মী ও চাকরিপ্রার্থীদের লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, প্রতিবন্ধিতা, ধর্ম বা বয়সসহ কোনো বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বৈষম্য না করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি জানান, নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি একটি পছন্দের কর্মক্ষেত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশের পাশাপাশি শেখা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে।

