বাংলাদেশে ঋণের সুদের হার কমছে। তবে অর্থনীতিতে গতি ফেরার কারণে নয়, বরং ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা জমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো তাদের বাড়তি অর্থ সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ করছে।
একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও তুলনামূলক সহজ মুদ্রানীতির দিকে এগোচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন সুদের হার বাড়িয়ে রাখার পর জুলাইয়ে নীতিসুদ ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে বাজারে অর্থের দাম আরও কমার চাপ তৈরি হয়েছে।
সুস্থ অবস্থায় থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঋণ ও আমানতের সুদের হার ১ থেকে ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি জুনে নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বেশির ভাগ ব্যাংকে এখন আমানতের সুদ ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে এবং ঋণের সুদ ১০ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নতুন ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। এতে এসব সরকারি ঋণপত্রের সুদের হারও এক অঙ্কে নেমে এসেছে।
জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ এক বছরের ব্যবধানে ৩৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও একই ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে। দেশে ডলারের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও আমদানি চাহিদা দুর্বল হওয়ায় টাকার ওপর শক্তিশালী হওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
রপ্তানিকারক ও প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষা এবং টাকার অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে আবার ডলার কেনা শুরু করেছে। ওই দিন ৫ কোটি ডলার কেনা হয় ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে, যা প্রবাসী আয় সংগ্রহের বাজারদরের ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৬০ পয়সার চেয়ে বেশি। এর ফলে ৩ সেপ্টেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেড়ে ৩৬ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এক বছরে মজুত বেড়েছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে সুদের হার কমার এই প্রবণতার পেছনে অর্থনীতির দুর্বল চিত্রও স্পষ্ট। ধীরগতির প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্বের কারণে অর্থনীতিতে স্থবিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগস্টে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু অর্থবছর ২০২৭-এর সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা এখনও অনেক বেশি। গত বছরও পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্তরের ওপর নতুন মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন প্রণোদনামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়াচ্ছে এবং আরও সহজ মুদ্রানীতির পরিকল্পনা করছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের আশঙ্কা, কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান না করে শুধু অর্থের জোগান বাড়ালে প্রকৃত চাহিদা ফিরবে না। বরং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
কেন সুদের হার কমাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে নীতিসুদ ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করে। ২০২২ সাল থেকে চলা কঠোর মুদ্রানীতির এটি ছিল বড় ধরনের পরিবর্তন। ওই সময়ে নীতিসুদ ধীরে ধীরে ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে বাড়ানো হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় দুই বছর ১০ শতাংশে রাখা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আগে ধারণা ছিল সুদের হার বাড়ালে অর্থের প্রবাহ কমবে, বাজারে তারল্য কমবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পদ্ধতি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। দুই বছর সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে রাখার পরও মূল্যস্ফীতি কমেনি।
বরং উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরবরাহ বাড়ানোর কৌশল পরীক্ষা করছে। সুদের হার কমিয়ে উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় কমানো গেলে সরবরাহ বাড়বে এবং প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন খরচ কমতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতিও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
সস্তা টাকা কি মূল্যস্ফীতি বাড়াবে
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, সুদের হার কমে যাওয়া আসলে অর্থনীতির স্থবিরতারই একটি লক্ষণ। তাঁর মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আমানতের প্রবৃদ্ধি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও নতুন ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো সেই অর্থ কাজে লাগাতে পারছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তারা বাড়তি অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। সরকারি ঋণের চাহিদা বেশি হওয়া এবং নিরাপদ এসব বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সুদের হার কমছে।
এজাজুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না বাড়া পর্যন্ত এই প্রবণতা চলবে। তবে উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু বাজারে অর্থের জোগান বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাঁর মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মূল দায়িত্ব সরকারের। অর্থনীতি চাঙা করতে বাজেটের মাধ্যমে করছাড়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
কাঠামোগত সমস্যায় থমকে আছে ঋণের চাহিদা
ঋণের সুদের হার কমলেও নতুন ঋণের চাহিদা বাড়ার কোনো লক্ষণ নেই। দেশের অন্যতম বেসরকারি ব্যাংক সিটি ব্যাংকে বছরের প্রথম নয় মাসে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় এটি প্রায় অর্ধেক। অথচ একই সময়ে ব্যাংকটির আমানত দুই অঙ্কের হারে বেড়েছে।
ব্যাংকটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে গেলেও প্রত্যাশিত ঋণের চাহিদা তৈরি হয়নি। বড় করপোরেট গ্রাহকদের তুলনামূলক কম সুদে ঋণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও গ্যাসের স্থায়ী সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণ নিতে চাইছে না।
ফলে সিটি ব্যাংক বাড়তি অর্থ সরকারি ঋণে বিনিয়োগ করেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রণোদনা তহবিলে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ দিয়েছে।
ব্যাংকটির ওই কর্মকর্তা জুনে বেসরকারি খাতে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধির সরকারি হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি সম্ভবত ঋণাত্মক। কারণ এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া ঋণ এবং বিদ্যমান ঋণের ওপর জমা হওয়া সুদের কারণে তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ মোট ব্যাংক ঋণের প্রায় ৩ শতাংশের সমান। পুরো অর্থ বাস্তবায়িত হলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৭ থেকে ৮ শতাংশে উঠতে পারে। অথচ অর্থবছর ২০২৭ সালে সরকারের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ প্রয়োজন।
এ ছাড়া শুধু টাকা সস্তা হয়েছে বলেই দুর্বল বা দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলো আগ্রহী হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সুদের হার কমার কারণ অতিরিক্ত তারল্য
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, সুদের হার কমার প্রধান কারণ হচ্ছে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য। এটিকে সরাসরি অর্থনীতি চাঙা করার কোনো পরিকল্পনার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তাঁর মতে, ঋণের প্রবৃদ্ধি থেমে গেলে ব্যাংকে টাকা জমতে থাকে। ফলে সুদের হার কমালেই ঋণের চাহিদা তৈরি হবে—এমনটা নয়। ব্যবসার পরিবেশ অনুকূলে না থাকলে শুধু কম সুদ দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়।
ব্র্যাক ব্যাংক করপোরেট ঋণের সুদের হার ১১ থেকে ১২ শতাংশে নামিয়েছে। নির্বাচিত বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে তা ৯ থেকে ১০ শতাংশ। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত ঋণের সুদ ১১ থেকে ১২ শতাংশে নেমেছে।
ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদের হার এখন প্রায় ৮ থেকে ৯ শতাংশ। অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলো তারল্য ধরে রাখতে ১১ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত আমানতের সুদ দিচ্ছে। এসব ব্যাংকের লক্ষ্য নতুন ঋণ দেওয়া নয়, বরং হাতে থাকা অর্থের সংকট সামাল দেওয়া।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাসেম মো. শিরিন বলেন, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছে।
তাঁর মতে, যখন ব্যাংকে প্রচুর অর্থ থাকে কিন্তু ঋণের চাহিদা কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সুদের হার কমে। বাংলাদেশ ব্যাংক বহু বছর ধরে বিভিন্ন নির্দেশনার মাধ্যমে সুদের হার কমানোর চেষ্টা করেছে। এখন বাজারের স্বাভাবিক শক্তিই সেই সমন্বয় ঘটাচ্ছে—একটি কার্যকর বাজার অর্থনীতিতে সাধারণত এমনটাই হওয়ার কথা।

